মিতার জীবন টা ভালই কাটছিল। ছোট এক ভাই আর মা নিয়ে থাকত ঢাকার মিরপুরে তাদের বাসায়। ভাই বোনে ঝগড়া, আবার ভাই এর জন্য বিশাল ভালোবাসা, খুনসুটি, মায়ের বকা এইসব নিয়ে। মিতার বাবা রফিক সাহেব, কাতারে পানি ব্যবস্থাপনা বোর্ড এ কাজ করে, ইন্জিনিয়ার ছিলেন, সরকারি চাকুরি করতেন, বেতনের টাকার অংক টাও ছিল ইর্ষনীয়। ৭৬ সালে কাতার যায় রফিক সাহেব। ৭৭ সালেই একটা ফ্রীজ কিনে আনে দেশে । ৮১ তে ২০" রঙীন টেলিভিশন, ঢাকার এয়ারপোর্টে সেটা ছিল ২য় রঙীন টিভির প্রবেশ। সুখ স্বাচ্ছন্দ্য যেন উপচে পড়ছিল তাদের জীবনে। রফিক সাহেব ছিলেন সৌখিন মানুষ, মেয়ের জন্য পুতুল ,খেলনা, ছেলেকে তিনি বাবু বলে ডাকতেন, বাবুর জন্য গাড়ি, খেলনা এমন কি তাদের বন্ধু দের জন্যও আনতে ভুলতেন না মিতার বাবা। পরিবার, আত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশী কারো জন্য গিফট আনতে ভুলতেন তিনি। এরকম সুখেই কাটছিল মিতার জীবন। চারপাশের মানুষজন দেখে মিতাদের পরিবারের ঔজ্জল্য। মনে করে যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে তারা, এমনই উন্নতি।
রফিক সাহেব আবার ছেলে মেয়ে ছেড়ে বেশীদিন বাইরে থাকতে পারতেন না, নিজের খরচেই ১০/১১ মাস পর পর দেশে আসা যাওয়া করতেন । যাই হোক, ৮২ তে মিতার আরেকটি ছোট বোন জন্মায় -নাম রাখে মুনিয়া। স্বর্গ যেন নিজে এসে ধরা দিয়েছে তাদের জীবনে। আনন্দ, প্রাচুর্য এরকম করেই চলছিল মিতার জীবন , ছোট ভাই, বোন, মা আর প্রবাসী বাবা।
৮২ এর কোন এক সময় মিতার বাবা অর্থাৎ, রফিক সাহেব হঠাৎ করেই ডান চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। কাতারে চোখের ডাক্তার দেখান, কিন্তু ডাক্তার বলে যে চোখ ঠিক আছে, কোন সমস্যা নাই। কিন্ত তিনি যে আসলেই দেখতে পারেন না। ফলে কাতারে তিনি কোন সুরাহা না করতে পেরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গেলেন ইংল্যান্ড। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো, মাথার ব্রেইন এর ভিতর তিন টা টিউমার ধরা পড়েছে, তা ডান চোখের দেখার নার্ভ কে ব্লক করে দিয়েছে এবং পরে আরো পরীক্ষা করে জানায় তা ক্যান্সার এ রুপ নিয়েছে তা। চিকিৎসা করাতে হবে।
রফিক সাহেব যেন অনেকটা চোখে অন্ধকার দেখলেন। তার টাকার অভাব নাই বটে, সবেমাত্র জীবন টা গোছানো শুরু করেছিলেন, বয়স তখন হবে বড়জোর ৩৭। কিন্তু ব্রিটেনে চিকিৎসা খরচ মানে অনেক টাকার ব্যাপার। যে কিছু টাকা তিনি জমিয়েছিলেন তা দিয়ে ঢাকার লালমাটিয়া তে জায়গা কিনবেন বলে ঠিক করেছেন, জায়গাও দেখা হয়ে গেছে, বায়না ও করা হয়ে গেছে ,বাড়ির প্ল্যান ও করে ফেলেছেন, জমাও দেবেন ডিআইটি তে। ঢাকায় যেয়ে জায়গা টা কিনে ফেলবেন এরকম চিন্তা করে রেখেছিলেন অথচ এখন সেই জমানো টাকা ভেঙে চিকিৎসা!!!! কি করবেন , বেঁচে থাকলে আরো রোজগার করতে পারবেন, না থাকলে কি হবে এই সংসারে। মিতার মা তো নিতন্তই সধারন এর গৃহিনী, কি করে সামলাবে তা অনুপস্থিতিতে !!!!
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা নিলেন, একসময় রেডিওথেরপি নিলেন, ২ টা ঠিক করলেন কিন্ত আরেকটা ব্রেইনের অনেক ভিতরে, অপারেশন ছাড়া সম্ভব না। অপারেশন করলেন কিন্তু পুরো টা সাকসেস হয় নাই। রেডিওথেরাপি তেও কাজ হয়নাই। ডাক্তার শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিল। সেটা ১৯৮৩ সাল। দেশে পাঠিয়ে দিল মিতার বাবা কে। বলে দিল , সে আর বড়জোর এক বছর বাঁচবে, ফ্যামিলি নিয়েই থাকুক। সবাই জানলো শুধু জানলো না রফিক সাহেব। দেশে চলে এলেন। কিন্তু তার অবচেতন মন বলত তিনি আর বেশীদিন নাই, তাই সারাক্ষন পাগলের মত সব কাজ শেষ করতে চাইতেন আর বলতেন - "আমার সময় নাই"। দুর থেকে চোখ মুছত মিতার মা ওরফে জোবাইদা বেগম, কষ্ট নিয়ে শুধুই কাঁদতেন তিনি , কিই বা করার আছে তার আর !!!!
মিতার জীবনের মোড় ঘোরা শুরু এখান থেকেই। স্কুলে থেকে এসে বাবাকে সেবা করে। বাবা প্রায়ই অগগান থাকে, বমি করে যখন তখন। মিতার মা ও সেবার কোন ত্রুটি রাখেনি। শেষ দিকে রফিক সাহেবের অবস্থা খুব খারাপ হলে ভর্তি করানো হয় পিজি তে। ১৯৮৪ এর সেপ্টেম্বরের এক ভোরে সেখানেই তিনি শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। মিতার জীবনের মোড় আরেকবার ঘুরে, তখন সে সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে আর তার ছোট ভাই বাবু ৪থ শ্রেনীতে আর একেবারে ছোট্ট টা - মুনিয়া , ওতো বুঝেই নাই, বাবার মৃত্যু কি। বাবার লাশ যখন আসে পিজি থেকে, ও তখন ছোট হাড়ি পাতিল নিয়ে খেলছিল বাসার সামনে !!!!!!
বাবার মৃত্যুর সাথে সাথে মিতার মা ওরফে জোবাইদা বেগম ও অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। তার ডান পায়ে ব্যাথা, উঠে দাড়াতে পারেনা। মিতার ছোট বোন - মুনিয়া, ভাই - বাবু - তাদেরকে মিতাই আগলে রাখে, গোছল করানো, খাওয়ানো সব তাকেই করতে হয়। বাবু কেও দেখা শোনা করে। সংসারের কিছু খুটি নাটি ও দেখা শুরু করা শিখছে তখন।
জোবাইদা বেগম পায়ে ব্যাথা নিয়ে এই ডাক্তার সেই ডাক্তার কাছে দৌড়াদৌড়ি করে। এক এক ডাক্তার এক এক মতামত দেয়। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়লো, পায়ে ক্যান্সার। চিকিৎসা চলতে থাকে। আজ এ হাসপাতালে, কাল ও হাসপাতালে, এভাবেই চলছিল ক্যান্সার এর বিরুদ্ধে তার লড়াই আর পানির থেকেও দ্রুত শেষ হতে থাকে টাকা পয়সা। এক সময় যা জমানো ছিল সব টাই শেষ হয়ে যায় চিকিৎসার পিছনে। জোবাইদা বেগম এর অবস্থাও দিন দিন খারাপ হতে থাকে।
ওদিকে মিতা ১৯৮৭ সালের এস.এস.সি র জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে , সেই প্রতিকুলতার ভিতর। মায়ের চরম অসুস্থতার ভিতর কারন তার মা স্বপ্ন দেখে মেয়ে পরীক্ষা দিতে যাবে, যাবার আগে তার পা ছুঁয়ে সালাম করে যাবে। কত বড় স্বপ্ন তখন জোবাইদা বেগমের কাছে, শুধু মেয়ের পরীক্ষা পর্যন্ত যেন বেঁচে থাকতে পারে - সারাক্ষন সেই প্রর্থনা খোদাতায়ালার কাছে। ঠিক এমন সময় ডাক্তার ঘোষনা দেয়, তিনি আর ৮ দিন বাঁচবে।
একদিন সকালে, জোবাইদা বেগম ভর্তি ছিলেন যে ক্লিনিকে, ফোন আসে সেখান থেকে, তখন মিতা বাসায়, বাবু স্কুলে। একটা স্কুটারে করে মিতা আর তার এক চাচা রওনা দেয় ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে , পথে থামে বাবুর স্কুলে, সোজা ঢুকে হেডমাস্টার এর রুমে, ঢুকে কি যেন আলাপ করলো তারা , তারপর দপ্তরি এসে বাবুর ক্লাশ টিচার কে কি যেন বললো কানে কানে, ক্লাশ টিচার ছুটি দিয়ে দিল বাবুকে, এমন কি ব্যাগ ও নিয়ে যেতে বারন করলো তার। বাবু তখন ক্লাশ সেভেন এ। একটু হলেও বুঝতে বাকী রইলো না, তার মার সময় হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। যেতে যেতে যত সুরা, দোয়া দুরদ আর মা যেন বেঁচে থাকে সেই দোয়া করতে করতে যাচ্ছিল বাবু।
ডাক্তার এর বেধে দেয়া সময়ের ৭ দিনের মাথায় , ১৯৮৭ সালের মার্চের এক সকালে মারা যান জোবাইদা বেগম । মিতার এস.এস.সি পরীক্ষার ঠিক পাঁচ দিন আগে। দেখা হোলনা মেয়ের এস এস সি পরীক্ষা। বলে যেতে পারলেন না কাউকে কিছু, অনেকটা অভিমান করেই চুপি চুপি ভোর বেলা সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই নিঃশব্দে চলে গেলেন তিনি।
চাচার সাথে মিতা আর বাবু কেবিন ঢুকে দেখে সাদা চাদর এ মোড়ানো তাদের মা। মাথার কাছে বসে এক চাচা, আর পুরো কেবিন সব খালা, মামা, দাদা দাদি, সবাই কাঁদছে। তার চাচা বাবুকে বুকে টেনে নিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, বাবু, সব শেষ। আসলেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল তিন ভাই বোনের। চারিদিকে আহাজারি। কান্নার করুন আওয়াজ। মিতা, বাবু - ভাই বোন অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকে, মাথার উপর কেউ রইলো না আর !!!! আড়াই বছর আগে বাবা মারা গেল, এখন মা। মা হারানো যেন মাথার উপর থেকে ছাদ সরে যাওয়া, সবচেয়ে নিরাপদ আর সবচেয়ে আদর এর জায়গা টা হারানো। বাবা গেল, মা ও নাই এত বড় পৃথিবীতে কি করে টিকে থাকবে তারা !!!!
আল্লাহ কে বড় নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল তখন। মুনিয়া তখন ছোট - কিছুই বুঝে নাই , এমনকি মার কআছে যাবো বলে কান্না জুড়ে দিলে অনেকদিন ধরে বোঝানো হত, মা হাসপাতালে।
তবুও মিতা পরীক্ষা দেয়, একটা জিদ, তার মা দেখতে চেয়েছিল তার এস এস সি পরীক্ষা , পরিক্ষা তাকে দিতেই হবে। আত্মীয়দের উৎসাহে, চোখের জলে ভিজে একাকার হয়ে, শিক্ষকদের উৎসাহে পরীক্ষা দেয় মিতা। সদ্যপ্রয়াত মায়ের মুখ খানি বারে বারে সামনে চলে আসে তার, কত শখ করছিল , মেয়ের এস এস সি পরীক্ষা দেখবে।
মিতা সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করে। অনভিজ্ঞ হাতে হাল ধরে সংসারের, মিতার নতুন পথ চলা শুরু হয়........। শুরু হয় তার জীবনের টিকে থাকার লড়াই, তার ভাই বোনদের নিয়ে টিকে থাকার লড়াই।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন