মিতার মা মারা যাবার পর মিতা, বাবু, মুনিয়া তাদের নতুন জীবন শুরু করল, এক নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। মিতা কোনদিন রান্না ঘরে যায়নি, জোবাইদা বেগম, অর্থাৎ মিতার মা মেয়ে কে কোন কাজ করতে দিতেন না, মেয়ে তো শ্বশুড় বাড়ী গিয়ে কাজ করবেই, তাই যতদিন মেয়ে কে আদর করে রাখা যায়।
মিতা এস এস সি পাশ করার পর লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হল। কলেজ থেকে এসে বিকালে অথবা রাতে রান্না করে, পুর্ব আভিগ্গতা না থাকলেও মিতার সুন্দর রান্না করা শিখে ফেলেছে কয়দিনেই। সকালে ৮ টার মধ্যে বের হয়ে যায় কলেজের উদ্দেশ্যে। বাবুর স্কুল ১০ টায়। সে স্কুলে যাবার আগে ভাত রান্না করে রেখে যায়। প্রথম দিন তো সে ভয়াবহ ধরনের ভাত রান্না করেছিল। সেটাকে ভাত না বলে চালের মন্ড বলা যেতে পারে। পরে আস্তে আস্তে বাবুও সুন্দর ভাত রান্না করা শিখে যায়, শুধু তাই না, রাতে যখন মিতা তরকারি রান্না করে , সে এটা সেটা এগিয়ে দেয় আর পাশে বসে টুকটাক রান্না ও শিখে ফেলেছে ততদিনে। মিতার ছোট বোন টাকে সামলানো ছিল বড় কষ্ট। যখন তখন মা'র কাছে যাব বলে কান্না জুড়ে দেয় , তখন মা হাসপাতালে, এখন যাওয়া যাবেনা - এসব বলে স্বান্তনা দিতে হত তাকে, বাইরে নিয়ে ঘুরে আসা, চকোলেট কিংবা কিছু কিনে দিয়ে , কোন আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে গিয়ে তাকে ঠান্ডা করতে হত। এভাবে চললো কিছুদিন। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। একদিন মুনিয়া ও বুঝে গেল মা হাসপাতাল থেকে আর আসবে না।
মিতার বাবা মারা যাবার পর আয় রোজগার ছিল না, ব্যাংক এ জমানো টাকা দিয়েই সংসারের খরচ আর মিতার মা'র চিকিৎসা চলতো। তিনি মারা যাবার পর সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাংকে অবশ্য বেশী টাকাও ছিলনা। কিন্তু ব্যাংক থেকে টাকা তুলবে কি করে ? যার সিগনেচার, তিনি তো নেই। মিতাদের ঢাকায় ২ টা টিনশেড বাড়ী আছে, তার অভিভাবক বা কে হবে? মিতারা যে জোবাইদা বেগম ও রফিক সাহেবের ওয়ারিশ, এটার প্রমান কি ? ব্যাংক এর দরকার ওয়ারীশ নামার কাগজ। কে করবে ? কি করে হবে? হিসাব অনুযায়ী তখনও মিতার বয়স মাত্র ১৬। আইন অনুযায়ী তারা নাবালক। বাবু তখন ১১। মুনিয়ার বয়স ৫ বছর। কে হবে তাদের টাকা পয়সার , ঐ ২ কাঠার উপরে ২ টা টিনশেড বাড়ীর গার্জিয়ান ? আর স্থাবর - অস্থাবর সম্পত্তির গার্জিয়ান?
একদিকে এই ঝামেলা, অন্যদিকে বিদ্যুত, গ্যাস, ওয়াসার বিশাল বিল বকেয়া। বাবা - মা'র চিকিৎসার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে এদিকে আর খেয়াল করা হয়নাই। বিচ্ছিন্ন করার নোটিশ দিয়ে যায় এক এক দিন এক এক কর্তৃপক্ষ। কেমন করে সামলাবে ? শাষন করার, উপদেশ দেবার লোকের অভাব হয় না। কিন্তু সাহায্য করার কেউ নাই।
দুঃচিন্তায় প্রায় খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দেয় মিতা। আর খাবে বা কি ? ইনকাম বলতে আরেক বাড়ির ভাড়া ১৩০০। অগত্যা ২ বেলা রুটি খেয়েই কাটাতে হত তাদের। আর কোন উপায় নেই। তখন আটা ছিল খুবই সস্তা। ঐ ১৩০০ টাকার মধ্যেই তাদের তিন ভাই বোনের পড়াশোনা, মিতার কলেজ আসা যাওয়ার খরচ, বাবুর স্কুলের বেতন, কলেজের বেতন আর সংসারের টুকিটাকি খরচ। ২ বেলা রুটি , তাও খুব হিসাব করে, ৩/৪ টার বেশী না, এবং পাতলা পতলা রুটি, যাতে আটা কম লাগে। এভাবেই চলছিল একদিকে তাদের বাবা মা হীন জীবনের প্রথম ভাগ।
অন্যদিকে তাদের ওয়ারিশ নামা বের করতে হবে। বের হল ওয়ারিশনামা। সে আরেক কাহীনি। যেহেতু সম্পত্তি তার মা'র নামে, তাই সেই সম্পত্তি তে তার নানা , নানীর ও অংশ আছে। নানা নানী তো সে অংশ নিবে না, তাই কোর্ট দাড়িয়ে জীবিত নানা নানী কে মৃত ঘোষনা দিতে হল তাদের।
স্থাবর্ - অস্থাবর সম্পত্তির ওয়ারীশ তারা তিন ভাই বোন হোল। কিন্তু তারা তো নাবালক। ব্যাংক তাদের কে টাকা দিবেনা, তারা জমি জমা বেঁচতে পারবে না। একজন বোৈধ আভিভাবক চায় ব্যাংক, আরও সব সরকারী কর্তৃপক্ষ। আরেক মহা মহা সমস্যা। মিতারা কি খেয়ে বেঁচে আছে , কেমন করে বেঁচে আছে কেউ খবর রাখেনা, কেউ ২ টা টাকা দিয়েও সাহায্য করে না , কিন্তু তাদের গার্জিয়ান হবার জন্য মহা উৎসাহ দেখা গেল আত্মীয় স্বজন দের। এক খালু হতে চান গার্জিয়ান, অপরদিকে আরেক খালু হতে চান, আরেক দিকে গার্জিয়ান হতে চান তার মামা। কিন্তু তারা কি খেয়ে বেঁচে আছে , সেই খবর নেবার সময় তাদের ছিলনা, বরং কখনও তার মামা তাদের বাসায় গিয়ে ভর্তা ভাত দেখে রাগে গজ গজ করতে বেরিয়ে গেছে না খেয়ে।
মিতাদের আপন কোন চাচা ছিল না, তার বাবার এক চাচাতো ভাই, তারেক সাহেব, সেই ছোট বেলা থেকে মিতা, বাবু, মুনিয়া কে কোলে পিঠে মানুষ করেছে, নানা রকম নিয়ম কানুন শিখিয়েছেন, কড়া শাষন ও করেছেন । আর তারা চাচা বলতে তাকেই জানতো। আপন চাচাও মনে হয় এত ভালোবাসেনা ভাতিজা ভাতিজির, যত ভালোবাসা ছিল তাদের জন্য। সেই চাচা কে আগেই সব মামা-খালা-খালু মিলে একদিকে সরায়ে দিয়ে তারপর লাগলো প্রতিযোগিতায় , কে হবে গার্জিয়ান। সবাই আপন, সবাই ভালো চায়। তর্ক- বিতর্ক - ঝগড়া শেষ পর্যন্ত দলা দলি তারপর ক্যাডার ভাড়া করা করি অবস্থায় পৌছাল অবস্থা - কারন একটাই - মিতাদের গার্জিয়ানশীপ। আসলে সবাই ভেবেছিল, রফিক সাহেব টাকার খনি রেখে গেছে তাই গার্জিয়ান হতে পারলে .........
এরকম কাহীনি গল্প উপন্যাস সিনেমায় দেখা যায় কিন্তু বাস্তবে ????? ঘৃনা, কষ্ট নিয়ে মিতা, বাবু দেখল তার আপন মানুষদের ভিতরের কুৎসিত রুপ। ভিতরে ভিতরে তারা দগ্ধ হতে লাগলো। কুকড়ে যেতে লাগলো ভিতরে ভিতরে। দুরে সরে যেতে লাগলো সবার কাছ থেকে। বিশ্বাস হারায়ে ফেলল মানুষের উপর। মানুষ এত লোভী , এত খারাপ হয় কি করে ? অবশেষে মিতার সেই চাচা, তারিক সাহেব উদ্ধার করলেন তাদের এই অবস্থা থেকে। চুপি চুপি গিয়ে, মিতার বয়স ১৮ দেখিয়ে, বাবু, মুনিয়ার বয়স বাড়িয়ে দেখিয়ে বের করলেন গার্জিয়ানশীপের কাগজ। তারা নিজেরই হোল তাদের বোৈধ আভিভাবক।
তার বিনিময়ে তারেক সাহেব মুখোমুখি হতে হয়েছিল সেই মানুষরুপী লোভী প্রানীদের। এমনকি সন্ত্রাসী ও লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল তার পিছনে। দুঃসংবাদ ছিল, যে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে ছিল তারেক সাহেবের বন্ধু, সব কিছু খুলে বললো সে মিতার সেই মহৎ চাচার কাছে। তিনি জানলেন মানুষ রুপী জন্তুদের কাহীনি।
ওদিকে আজ কারেন্ট লাইন কাটে তো কাল গ্যাস এর লাইন। ব্যাংক থেকে বাকী টাকা তুলে , অল্প কিছু জমি জমা ছিল তা বেচে বকেয়া বিল শোধ করতে হয়েছে। নতুন করে আবার লাইন নিতে হয়েছে।
এর মধ্যে তাদের বাসার ২ রুম ভাড়া দিয়ে রোজগার আরেকটু বাড়ালো। ২ রুমের ভড়া ১২০০। আর আরেকট বাড়ি ভাড়া একটু বাড়লো - ১৬০০।মোট ২৮০০ - এই ইনকাম দিয়ে চলে তাদের জীবন। ২ বেলা রুটি খেতে হয়না তখন আর, সবার মত তিন বেলা খাওয়া দাওয়া করতে পারতো কিন্তু রাতে খাবার পর সকালে কি খাবে সেই দুঃশচিন্তা নিয়ে ঘুমতে যেত তারা। তখন তাদের সাহায্য করেছে খুব ইলিশ মাছ। ২০/৩০ টাকা দিয়ে যে ইলিশ পাওয়া যেত, সেই ইলিশ এনে কয়েক টুকরো নিয়ে এক এক ভাগ করে এক এক দিন - এভাবে চলতো , দেখা যেত পুরো গরমে ভাতের সাথে শুধু ইলিশ এর তরকারি খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে তারা।
সবচেয়ে কষ্ট কর ছিল ঈদ। বাড়তি রোজগার নাই। সেই বাড়ী ভাড়া থেকে ঈদের কয়েক মাস আগ থেকে মিতা একটু একটু করে জমিয়ে ২ ভাই বোনের জন্য কিছু কিনতো। তার জন্য কেনার কেউ ছিলনা, কাপড় পেয়ে খুশী হতে পারতো না বাবু কিংবা মুনিয়া। বড় বোনের তো নতুন কাপড় নাই!!!!! গার্জিয়ানশীপ নিয়ে সেই ঝামেলার পর মামা-খালারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের কাছ থেকে। দেখা যেত ঈদের আগের দিন , মিতাদের সেই চাচা মিতার জন্য একটা শাড়ী কিনে আনতো। সে খুশী তে তিন ভাই বোন গলা ধরে কাঁদতো, ঈদের আগের দিন। আর বছরে ২ দিন মুরগী - ২ ঈদে। সেটা তাদের ছিল পরম পাওয়া।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন