বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


রবিবার, ২৩ মে, ২০১০

সেমিনার

আজ খুব সকাল সকাল উঠেছেন মিসেস করিম। এরকম সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে না । আজ সকালেই একটা সেমিনারে যেতে হবে সেখানে বিদেশী ডেলিগেটরা আসবে তাই সকাল সকাল বিছানা ছাড়েন মিসেস করিম। বারান্দায় গিয়ে দেখেন কুয়াশায় ঢাকা বাইরের ভোর। বেশ কুয়াশা পড়েছে, দুরের জিনিস স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছেনা। বারান্দায় গিয়ে ভাবলেন এক কাপ ধোয়া ওঠা গরম চা খেতে পারলে ভালো লাগতো। বারান্দা থেকে ভিতরে এসে বাসার ভৃত্য জরিনার রুমে গিয়ে ডেকে তুলেন মিসেস করিম
- কি রে ঘুম ভাঙ্গে নাই ?
দরজা খুলে মিসেস করিম কে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে যায় জরিনার। ভাবে অনেক দেরী হয়ে গেছে উঠতে। অপরাধী চোখে তাকায়ে বলে
- কাল ঘুমাতে একটু দেরী হইয়া গেছিল তাই উঠতে দেরী……
- আরে এখনও তো ভাল করে সকাল হয় নাই , আমিই আজ তাড়াতাড়ি উঠলাম। শোন , হাত মুখ ধুয়ে আমার জন্য এক কাপ গরম লেবু চা দিয়ে যা বারান্দায়।
বলেই চলে গেলেন মিসেস করিম।
এই ফ্ল্যাটে এক রুমে থাকেন মিসেস করিম, আরেক রুমে তার সাহেব। তাদের পারসোনাল কাজে সমস্যা হয় বলে দুজন দুই রুমে থাকেন। তাদের একমাত্র ছেলে হাসিব ইউ কে তে পড়াশুনা করে। করিম সাহেবের বিশাল ব্যবসা। সারাদিন ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি। আর মিসেস করিম ও একজন ব্যস্ত মানুষ। একটা এনজিও আছে তার। সমাজের দুঃস্থ মহিলাদের জন্য তারা কাজ করে। বিদেশ থেকে ডোনার রা আসে তাদের সামলানো, আসহায় মহিলাদের নিয়ে কাজ করা , সেমিনার, বিদেশ ভ্রমন, পার্টি, মেহমান সামলানো , লেখা লেখি নানান কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। এরই সাথে শরীর টাও ধরে রেখেছেন। বয়স ৪৫+ কিন্তু এখনও মেদ হীন শরীর , চেহারায় যথেষ্ট লাবন্য রয়েছে তার গলায় , চোখের কোনে কোন ভাজ পড়ে নাই এখনও, অনেক মহিলার চোখে ইর্ষনীয়, অনেক পুরুষের কল্পনার দেবী তিনি। তার এই এনজিও আজ বাসা-বাড়ীর কাজের মানুষদের অধিকার নিয়ে একটা সেমিনারের আয়োজন করেছে। গৃহ পরিচারিকা দের অধিকার নিয়ে তারা এবার কাজ শুরু করবে আর সেই জন্যই আজকের এই সেমিনার। এখানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, বিদেশী ডেলিগেট, সাংবাদিক , সাংস্কৃতিক কর্মী সহ অনেক লোক থাকবে।
- খালাম্মা আপ্নের চা
বারান্দায় বসে ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগাচ্ছিলেন মিসেস করিম , এমন সময় জরিনা চা নিয়ে আসে। জরিনা সকাল থেকেই মিসেস করিম এর ব্যবহারে বেশ অবাক হচ্ছে। গতকাল রাতেও তাকে চুলের মুটি ধরে চড় থাপ্পর মেরেছেন মিসেস করিম। কড়া ভাষা ছাড়া কখনও কথা বলেন না অথচ আজ বেশ ভালো ভাবে কথা বলছেন। তবুও দুরু দুরু বুকে চা নিয়ে যায় জরিনা।
হাত বাড়িয়ে চা নেয় মিসেস করিম। জরিনা দাড়িয়ে থাকে বারান্দায়।
- খালাম্মা একটা কথা কইতাম
- কি?
- বাবায় ফুন করছিল কাইল রাইতে , মা’র শরীল ডা খুব খারাপ, ডাক্তর দেখানো দরকার। মায়ের বুকের ভিতর নাকি ফাপর লাগতাছে , শ্বাস লইতে কষ্ট হইতাছে। কিছু টাকা চাইছে ডাক্তর দেখাইব। আমার বেতন থেইক্যা ৫০০ টাকা দিতে পারবেইন?
- এখন আমি টাকা কোথা থেকে দিব ? যখন তখন টাকা চাইলেই কি পাওয়া যায় ? দেখলি না এই মাসে আমার কত খরচ গেল। ৫/৬ টা বিয়ের গিফ্ট কিনতে হল, বিদেশী মেহমান রা , তোর খালুর মেহমান রা খেল কতবার। আমার হাত পুরো খালি। মাস শেষ হোক, তার আগে টাকা পাবিনা। এখন যা, ঘরের কাজ সার
"মেজাজ টাই গরম করে দিল" - একা একা বিড় বিড় করে বলেন মিসেস করিম। এই ছোট জাত কে তার কোন দিনই পছন্দ না । কিন্তু কি করবে , বাড়ীর কাজের জন্য লোকজন তো রাখতে হয়। চা না শেষ করেই রুমের ভিতর চলে গেলেন তিনি। শাওয়ার নিতে হবে। তার শাওয়ার মানে সুধু শাওয়ার না , হাত পা এর আঙ্গুল পেডিকিউর, মেনিকিউর করা, মুখে ফেসিয়াল করা, মাথায় গরম তোয়ালের ভাপ নেয়া - সব মিলায়ে প্রায় ২ ঘন্টার অভিযান।

জরিনা তার কাজে মন দেয়। খালাম্মার জন্য এক রকম নাস্তা , খালুর জন্য আরেক রকম নাস্তা। মিসেস করিম সকালে সব্জি সেদ্ধ, জুশ খায় আর করিম সাহেব খায় রুটি, ডিমের সাদা অংশ সিদ্ধ, ভাজি আর চা। জরিনা মা’য়ের অসুখের কথা ভুলে কাজে মন দেবার চেষ্টা করে। কাজের মাঝে মাঝেই চোখে ভেসে উঠে মা’র চেহারা টা। এক বছর হয়ে গেল প্রায় মা’কে দেখেনা। বাবার অসুখ, আয় রোজগার করতে পারে না তাই এই বাসায় কাজে পাঠায় দিছে তার মা। ভাবছিল এরা বড়লোক, ভালো থাকবো। জরিনা ভালই আছে। সার্ভেন্ট রুমে থাকে, আলাদা টয়লেট। ওর জন্য আলাদা মোটা চালের ভাত রান্না করা হয়, ফ্রীজে ২/৩ দিনের বাসি তরকারি জোটে সেই ভাতের সাথে। না খেয়ে থাকার চেয়ে এই টা বা কম কিসে !!! সাথে মাস গেলে বেতন। জরিনা নাস্তা বানায়ে খাবার টেবিল গোছায়।

করিম সাহেব প্রতিদিনের মত সকালে ঘুম থেকে উঠে এসে ফ্যামিলি লিভিং এ এসে বসে একটা সিগারেট ধরান , জরিনা চা এগিয়ে দেয়। চা আর সিগারেট টা খেতে খেতে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বুলান তিনি।
মিসেস করিম টয়লেট থেকে বের হয়ে জরিনা কে ডাকেন। মিসেস এর গলা শুনে অবাক হন করিম সাহেব। তার মিসেস কে তো এত সকালে কখনও ঘুম থেকে উঠতে দেখেন নাই। কি ব্যাপার ?
- হানি এত সকালে ঘুম থেকে উঠলে যে ?
- গুড মর্নিং হানি। আজ একটা সেমিনার আছে সকাল সকাল যেতে হবে তাই আর কি। তোমার কেমন চলছে ? ঐ শিপমেন্ট কি গেছে ঠিক মত?
স্বামী স্ত্রীর ভিতর ফর্মালিটিজ এর সুরে কথা বার্তা চলে কিছুক্ষন। প্রায় ৪/৫ দিন পর আজ কথা হল। করিম সাহেব সময় পাননা কথা বলার। তিনি বিজনেস মিটিং করে বাসায় ফিরেন অনেক রাতে। মিসেস অত রাত পর্যন্ত জাগতে পারেন না , ঘুমিয়ে পড়েন তার মত।

সাহেবের সাথে কথা শেষ করে তার রুমে ঢুকেন মিসেস করিম। আলমিরা থেকে শাড়ী বের করেন। সেমিনার উপলক্ষে গত সপ্তাহে এই জামদানি কিনেছিলেন টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা দিয়ে। গত রাতে ব্লাউজ কিনে এনেছেন। শাড়ী পেঁচিয়ে তার সাথে মানান সই গহনা পড়েন তিনি। ম্যাচিং করে স্যান্ডেলও কিনতে হয়েছে তার। সব সময় শপার্স ওয়ার্ল্ড থেকেই কেনা কাটা করেন কিন্তু আজকের সেমিনারে দেশী শাড়ী না পরে গেলে মানাবে না বলেই আজ জামদানি শাড়ী পরা। যতটুকু সম্ভব হালকা সাজ দিয়ে বের হন রুম থেকে। করিম সাহেব অফিসে চলে গেছেন ততক্ষনে।

টেবিল এ নাস্তা সাজানো থাকে। হালকা নাস্তা করে নেন তিনি। জরিনা কে কাজ বুঝিয়ে দেন।
তারপর ফ্ল্যাটের মেইন দরজায় বাইরে থেকে তালা মেরে তিনি বের হন গৃহ পরিচারিকা দের অধিকার নিয়ে আয়োজিত সেমিনার এ।

1 টি মন্তব্য: