বিমানের চাকা ঢাকা এয়ারপোর্টের এর রানওয়ে ছোবার সাথে সাথে জেমস এর শরীরে এক ধরনের শিহরন খেলে গেল। জানলা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলো সে। তখনো ভালো করে ভোরের আলো ফোটেনাই । তেমন বিশেষত্ব কিছু পেল না বাইরে তাকিয়ে। ৩৭ বছরের জীবনে আজই সে প্রথম বাংলাদেশ এলো। অথচ আরও আগে আসার কথা ছিল তার।
বিমান টি ঘুরে ঘুরে একটা সময় থাকলো। জেমস অন্য সব যাত্রীদের সাথে নেমে টানেল দিয়ে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করলো। তেমন আহামরি কোন এয়ারপোর্ট না। আশ পাশ হালকা ময়লা। পুরোনো বেল্টে করে লাগেজ আসার পর তেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই লাগেজ নিয়ে গ্রীন চ্যানেল দিয়ে বের হয়ে এল । বের হয়ে আসতেই একটা উটকো গন্ধ নাকে লাগলো জেমসের। দেখে চারপাশ গ্রীল দিয়ে ঘেরা , তার বাইরে জনতার ভীড়। গ্রীলের ভিতর গাড়ি এসে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্য সব যাত্রীদের। জেমস কে নিতে আসার জন্য একজনের আসার কথা ছিল বিমানবন্দরে। জেমস মাথা উচু করে খুঁজতে লাগলো তাকে নিতে আসা লোকটিকে।
ভিড়ের পিছনে জেমস-কানাডা নামে প্লাকার্ড দেখে আস্বস্ত হয় জেমস। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় গেটের দিকে। গেট দিয়ে বের হতেই ক্যাব চালকদের ডাকাডাকি , ভিক্ষুকের হাত পাতা, হকারদের হাক ডাক উপেক্ষা করে জেমস এগিয়ে যায় প্লাকার্ড ধরা লোকটার দিকে। পরিচয় দেয়। প্লাকার্ড ধরা লোকটার নাম হাসিব। হাসিবের সাথে পরিচত পর্ব শেষ করে রওনা দেয় দুজন । বাইরে থেকে মাথা ঘুরিয়ে আরেকবার দেখে নেয় এয়ারপোর্ট টিকে।
হাসিব গাড়ী নিয়ে এসেছিল, তার গাড়ীতে করেই দুজন রওনা দেয়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে গাড়িটি ডানে মোড় নেয়। জেমস গাড়ির ভিতর থেকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে নতুন জায়গা। রাস্তার দুপাশ সুন্দর করে সাজানো, ভাঙা চোরা বাস হুস করে পার হয়ে যচ্ছে পাশ দিয়ে। রাস্তা জুড়ে প্রাইভেট কার, মাঝে মাঝে সবুজ রঙের তিন চাকার বাহন। মাঝে মাঝে দৌড়ে লোকজন রাস্তা পার হচ্ছে। সাথে হাসিবের আলাপচারিতা। বাংলাদেশ কে বন্যা ঝড়ের দেশ হিসাবেই জানতো জেমস। এখানে সবাই বস্তিতে থাকে, মানুষ গুলো প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে - এরকম ধারনা নিয়েই ছিল এতদিন। আসার আগে ইন্টারনেটে বাংলাদেশ নিয়ে ঘাটাঘাটি করে অনেক কিছু জেনেছে। এ দেশ শুধু ঝড় বন্যার দেশ না , এখানে অনেক কিছু আছে- অপার সৌন্দর্য আছে, ঐতিহ্য আছে, যুদ্ধ জয়ের গর্ব আছে । এ দেশের যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে জেমসের জন্মের ইতিহাস।
সেই ইতিহাসের খোঁজেই জেমসের বাংলাদেশ আগমন।
জেমসে আর হাসিব কে নিয়ে গাড়ীটি গুলশানের একটি হোটেল এর সামনে এসে দাড়ায়। হাসিব আগে থেকেই রুম বরাদ্দ করে রেখেছিল জেমসের জন্য। হোটেলের রুমে ঢুকে দুজন। তারপর হাসিব তাকে বুঝিয়ে বিকালে আসার কথা বলে হোটেল থেকে বের হয়ে আসে।
হাসিব অফিসের কাজ শেষ করে আবার ফিরে আসে জেমসের হোটেল রুমে। সকালে আসার পর গোছল করে সেই যে ঘুমায়ছিল , হাসিবের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙে জেমসের।
- হ্যালো হাসিব । কানাডিয়ান উচ্চারনে ভিতরে আসতে বলে জেমসে। হাসিব ভিতরে গিয়ে বসে।
জেমস ফ্রেশ হয়ে এক সঙ্গে চা খায়। পরের দিনের কাজ ঠিক চলে যায় হাসিব।
পরদিন দুজনে মিলে রওনা দেয় ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়া গ্রামের উদ্দেশ্যে। সেখানেই যাবার জন্য এসেছে জেমস। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম শুরু হবার আগেই রওনা দেয় তারা। গুলশান থেকে রওনা দিয়ে রোকেয়া সরনী হয়ে গাবতলি হয়ে ঢাকা ছাড়ে তারা। গাবতলি ছাড়তেই দুপাশে অসংখ্য ইটের ভাটা চোখে পড়ে। জেমস ঘুরে ঘুরে দেখে চারপাশ।
বাতাস ভেদ করে তাদের গাড়ি যেতে থাকে সাভার রোড ধরে।
- কেমন লাগছে বাংলাদেশ ? ইংরেজীতে প্রশ্ন করে হাসিব।
- ভালো। জেমসের মুখে বাংলায় ভালো শুনে অবাক হয় হাসিব। ঠোটের কোন হাসি ফুটে উঠে।
হাসিব জায়গার নাম ধরে ধরে চিনিয়ে দেয় পার হয়ে যাওয়া প্রতিটা এলাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে তাদের গাড়ি স্মৃতি সৌধের সমনে দিয়ে এগোতে থাকে। পুরো সময় টা জুড়ে জেমসের হাতে একটা অনেক পুরোনো ডায়েরি ধরা। মাঝে মাঝে ডায়েরি টা খুলে , কি যেন পড়ে আবার চোখ বুজে জেমস। হাসিব আড় চোখে তাকিয়ে দেখে। জেমস কে দেখতে কানাডিয়ান মনে হয় না। মনে হয় পুরো দস্তর বাঙালী। শুধু ভাষার পার্থক্য - এই যা
দুপুর নাগাদ তারা পৌছে যায় ভাটিয়া পাড়া গ্রামে। আসার পথে বিস্তির্ন ফসলের মাঠ , মাঝে মাঝে আলগুলো যেন আরো অপরুপ করেছে মাঠের সৌন্দর্য কে। দুরে গাদাগাদি করে থাকা বাড়ী গুলো বলে দেয় গ্রামের উপস্তিতির কথা। মুগ্ধ চোখে দেখে জেমস।
এক মহিলাকে খুঁজতে এতদুর এসেছে জেমস। কিন্তু কার কাছে খুঁজবে ? কে বলতে পারবে মহিলার ঠিকানা ? তিনি কি বেঁচে আছেন কি না তাও জানেনা জেমস।
ঘুরে ঘুরে গ্রামের মুরুব্বি টাইপের লোকের সাথে দেখা করে তারা। হাসিব পুরো ঘটনা বর্ণনা করে তার কাছে। সব শুনে মুরুব্বী গ্রামের উত্তর পাড়ায় একটা বাড়ীর কথা বলে, হারু নামে একজনে থাকে , ওখানে গেলে হয়তো খোঁজ পেতে পারে। তারা রওনা দেয় সেই বাড়ীর উদ্দেশ্য। তাদের গাড়ির পিছ পিছ অনেক ছেলেপুলের ভিড়। দুরে দাড়িয়ে থাকে, গাড়ির পিছ পিছ যায়।
গ্রমের রাস্তার ধুলো উড়িয়ে তাদের গাড়ি যায় উত্তর পাড়ার সেই বাসায়। একজন মহিলা তখন রান্নার কাজ শেষ করে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিল। তাদের ডাক শুনে মাথায় লম্বা করে ঘোমটা দিয়ে আবার ঝাড়ু দেয়া শুরু করে।
হাসিবের ডাক শুনে একজন সাদা দাড়ি ওয়ালা বের হয়ে আসেন। কপালের কাছে কাটা দাগ। পা টেনে টেনে হেঁটে আসেন তাদের কাছে। সম্ভবত তার এক পা খোড়া।
-কিডা তুমি বাপ ? হারু মিয়ার চোখে জিজ্ঞাসা
- জ্বী আপনার নাম কি হারু মিয়া ? আমি হাসিব, ঢাকা থেকে এসেছি। আর ও জেমস , বিদেশ থেকে এসেছে। হাসিব উত্তর দেয়।
- হ্যা। আমি হারু মিয়া ক্যান? তার কাছে সাধারনত কেউ আর এখন আসেনা, ভোটের সময় ছাড়া।
- আপনার কাছে একটু দরকার ছিল।
হারু মিয়ার কপালে ভাঁজ পড়ে।
- আসো ভিতরে আইসে বস। তাদের কে নিয়ে যায় বাড়ীর ভিতর। হারু মিয়ার সাথে তারা দোচালা টিনের ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসে। হাসিব তারপর এক এক করে বলতে থাকে তার পাশে বসা জেমসের আসার কারন।
হারু মিয়া চোখ মুছে শুনে। জেমসের হাত টা ধরে বাচ্চা মানুষের মত কেঁদে উঠে হারু মিয়া। ঠান্ডা হয়ে হাসিব আর জেমস কে নিয়ে যায় তার বাসার পিছনে।
সেখানে একটা ভাঙা ঘরে একজন মহিলা বসে আছে। মাটির মেঝে তে শত ছিদ্র কাঁথা বিছিয়ে বসে আছেন একজন বৃদ্ধা। ঘরের চারপাশ বেড়া , ছন দিয়ে ছাদ বানানো। গায়ে তার পুরোনো ছেঁড়া শাড়ী , কালো হয়ে গেছে ময়লায়। মাথার চুল উস্কোখুস্কো, জট ধরে গেছে চুলে। হাড় জির জিরে শরীর। গত ৩৭ বছর ধরে এভাবেই বসে আছেন তিনি। কথা বন্ধ হয়ে গেছে তার। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করে না। কোন দিন খায় তো খায়না। হারু মিয়াই তাকে খাবার দেয় , থাকার জায়গা দিয়েছে। হারু মিয়ার মেয়ে মাঝে মাঝে তাকে গোছল করিয়ে দেয়। এভাবেই কাটছে তার জীবন। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন , কেউ ধরলে মাথা উচু করে কিছুক্ষন দেখে তারপর আবার নিচে তাকায় আগের মত।
তাদের বাসর রাতেই তাকে ফেলে স্বাধীনতা যুদ্ধে চলে যায় ঐ বৃদ্ধার স্বামী। যুদ্ধের সময় মাঝে মাঝে পালিয়ে রাতে আসতো । কখনো দলবল নিয়ে কখনও একা। যেভাবে পারতো সাহায্য করতো স্বামী কে, তাদের দলবল কে। তারপর একদিন শুনে স্বামীর মৃত্যুর কথা। পাকিস্তানি বাহীনির সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মারা যায় তার স্বামী। সেদিন স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে ভেঙে পড়েনি সে। সবাই যখন পালানোতে ব্যাস্ত তখন সে কোথাও যায়নি। মুক্তিবাহীনির সদস্যদের কে সাহায্য করাও বন্ধ করেনি সে।
যুদ্ধের সময় একদিন এই বৃদ্ধা কে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়, পাক বাহীনির ক্যাম্পে আটকে রাখে তাকে কয়েকদিন। তার উপর পোৈশচিক আত্যাচার চালায় পাকবাহীনি। তার ঘরবাড়ীও জ্বালিয়ে দেয়া হয় তখন।
তাদের অত্যাচারের ফসল হিসাবে তার কোল জুড়ে আসে এক সন্তান। যখন সেই শিশুকে ভুমিষ্ট করার অপরাধে গ্রামের সবাই দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয় তখন এই হারু মিয়াই তাকে আশ্রয় দেয়। হারু মিয়াও একজন মুক্তিযোদ্ধা। বৃদ্ধার স্বামীর সাথে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছিল সে। এক পা উড়ে গেছিল বোমার আঘাতে। নকল পা লাগিয়ে চলাফেরা করে হারু মিয়া।
আজকের জেমসে সেদিনের সেই শিশু। যুদ্ধ শিশু। তার জন্মের পর তাকে তুলে দেয়া হয় একটা চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানে। এক কানাডিয়ান দম্পতি তাকে দত্তক নেয়। জেমসের সেই কানাডিয়ান মা মৃত্যুর আগে একটা ডায়েরি দিয়ে যায় জেমসের কাছে। জেমস জানতে পারে সেখানে তার জন্মের পুরো ঘটনা। তার আগে কোনদইনই তারা বলেনি জেমস কে যে সে যুদ্ধ শিশু।
আজ তার জন্মদাত্রী মা কে দেখার জন্যই এতদুর ছুটে এসেছে জেমস।
কিন্তু যাকে দেখছে সেই কী তার মা ? ডায়েরির বর্ননা আর হারু মিয়ার দেয়া বর্ননা শুনে মনের ভিতর দানা বাঁধে নানান প্রশ্ন তবু যেন বিশ্বাস করতে পারে না সে।
জেমস আশ পাশ তাকিয়ে দেখে। ঝাপসা হয়ে আসে তার চোখ। অস্ফুষ্ট স্বরে ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠে - মা।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন