বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


বুধবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১০

ঘুনপোঁকা

দোতালা বাড়ী। বিশাল টানা বারান্দা। আশি সালের দিকে তৈরী করা এই মফস্বল এলাকার প্রথম বড় বাড়ী। লতা পাতার ডিজাইনে বারান্দার গ্রীল। বড় বড় কক্ষের লাল মেঝে তে কালো বর্ডার।

রুদ্র দুপুর থেকেই চুপ করে বসে আছে এই দোতলা বাড়ীর দ্বীতিয় তলার টানা বারান্দায়। পুরো বাড়ী যথারীতি নিরব। চোখ বুজে বসে আছে সে, তাঁর দাদার আরাম কেদারায়। রুদ্রর দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতিদিন নিয়ম করে বিকাল হলে এই আরাম কেদারায় এসে বসতেন। নানান লোকজন আসতো তাঁর কাছে। ভিতর থেকে রুদ্রর দাদী পান বানিয়ে দিতেন তাদের জন্য। দাদা মারা যাবার পর থেকে কেউ আর আসেনা , আর তাঁর দাদীও অসুস্থ্য হয়ে এখন বিছানায় শুয়ে থাকেন সারাক্ষন। পাচুর মা'ই এখন সব সামলায়। দোতলার পুরো বাড়িতে এই তিনটি প্রানী। নিচ তলা ভাড়া দেয়া একটা এন জি ও এর কাছে। অফিসের কারনেই সেখানে কিছুটা লোকজন আসা যাওয়া রয়েছে।

বারান্দার সামনে একটা অনেক আগের জলপাই গাছ। শীতকাল বলে এখন ডাল ভেঙ্গে জলপাই ধরেছে। কয়েকটা ডাল এসে নুইয়ে পড়েছে বারান্দার দিকে।গাছের ডালে ডালে শিশির জমতে শুরু করেছে। রাত্রি গভীর হলে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরবে, কান্নার মত।

শীতের বিকেলে ঝুপ করেই নামে, আর বিকাল নামতেই সন্ধ্যা । সন্ধ্যা নামতে না নামতেই চারপাশ কুয়াশা । পাচুর মা ঘরের বাতি জ্বালায়। রাত্রের রান্নার যোগাড় করতে যায় রান্নাঘরে। রুদ্র একই ভাবে বসে আছে আরাম কেদারায় । সামান্য নড়া চড়াও নাই। তাঁর মন খারাপ কি না সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সে চোখ বুঝে।

রুদ্রর বাবা- মা'র ডিভোর্স হয়ে যাবার পর থেকে সে দাদা দাদীর কাছেই বড় হয়েছে। আর বাবা-মা'র ডিভোর্সের গ্লানি তাঁকে ঘিরে রেখেছে ছোট বেলা থেকেই। আর সে কারনেই সে দূরে দূরে রেখেছে নিজেকে সবার কাছ থেকে। একটা সময় মনে হয়েছে, বাবা-মা মারা গেলে, বাবা-মা হারানোর কষ্ট টা এই থেকেও না থাকার কষ্ট থেকে ঢের ভালো, ঢের সম্মানের !!!

রুদ্রর আড়াই বছর বয়সেই তাঁর বাবা-মা'র ডিভোর্স হয়ে যায়। তার মা আরেক জনের সংসারে আর বাবা আরেকটা বিয়ে করে ঢাকাতে স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে নাম লেখিয়েছে। কেউ তাঁর খোজ নেয়নি , নেবার প্রয়োজনও মনে করেনি। তাঁর দাদা মারা গেলে তাঁর বাবা একবার এসেছিলেন। বুদ্ধি হবার পর সে সময় তার প্রথম দেখা তাঁর জন্মদাতা কে। সে প্রথম দেখায় আলাদা কোন আবেগ ছিল না, জন্মদাতার প্রতি ছিলনা কোন টান। অন্যসব অতিথি দের থেকে আলাদা করে মনে হয়নি তাঁর!

তাঁর বাবা মা'র বিয়ের কোন ছবিও ছিলনা । এই মফস্বলে তখন ছবি তোলার মত চিন্তাও কেউ করেনি। তাই জীবনের ২৪ বছর পার হলেও তাঁর জন্মদাত্রীর চেহারা দেখেনি সে। তিনি হয়তো ভুলেই গেছেন তাঁর একটা ছেলে জন্মেছিল কোন এক কালে !!!

রুদ্র চুপ করেই বসে আছে দুপুর থেকে। মনের ভিতর একটা চিনচিনে ব্যাথা, কোথাও একটা কষ্ট তাঁকে অনবরতঃ খোঁচাচ্ছে ভিতরে। নিজেকে বুঝাচ্ছে, কষ্ট পাবার মতন কিছুই ঘটেনি এখানে। তবুও সে কষ্ট পাচ্ছে। নিজেকে বার বার বোঝাচ্ছে , কষ্ট পাবার কিছু নাই, যাকে সে কোনদিন দেখিনি তাঁর জন্য কষ্ট পাবার কিছু নেই ।

দুপুরে কে একজন এসে রুদ্রর দাদীর সাথে দেখা করে। তারপর তাঁর দাদী তাঁকে ডেকে নিয়ে পাঠায় পাচুর মা'রে দিয়ে । রুদ্র জানতে পারে গতকাল তাঁর জন্মদাত্রী মারা গেছেন।

রুদ্র নিজেকে জিজ্ঞাসা করে, তাঁর কি কষ্ট পাওয়া উচিত ???

নিজের করা প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে বেড়ায় !!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন