বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০১৫

বিলাসী ২০১৩

 ১
পাকা ২ ঘন্টা বসিয়া ব্লগ লিখিতে যাই । আমি নই, কয়েকশত জন। যাহাদেরই বাটী কিংবা অফিস এরুপ আইটি পল্লী তে তাহাদের সকলকেই এরুপ করিয়া ব্লগ লিখিতে হয়। ইহাতে লাভের অঙ্কে শেষ পর্যন্ত একেবারে শূন্য না পড়িলেও, যাহা পড়ে, তাহার হিসাব করিবার পক্ষে এই কয়টা কথা চিন্তা করিয়া দেখিলেই যথেষ্ট হইবে যে , সকাল বিকাল ৪ ঘন্টা বসিয়া থাকিয়া ব্লগ লিখিতে হয় তাহাই নহে, ঢেড় বেশী - বারে বারে কানেকশন কাটিয়া যায়, আন্তর্জালের গোলাকার চাকতি ক্রমাগত ঘুরিতে দেখিয়া , মশক দংশন সহিয়া, একনাগাড়ে বসিয়া ব্লগে যাইতে হয় সে দুর্ভাগা বালকদের মা-সরস্বতী খুশি হইয়া বর দিবেন কি, তাহাদের যন্ত্রণা দেখিয়া কোথায় যে তিনি মুখ লুকাইবেন, ভাবিয়া পান না।
তাহার পরে এই কৃতবিদ্য ব্লগারের দল বড় হইয়া একদিন ব্লগেই বসুন, আর ফেসবুকেই যান —তাঁদের চার-ঘন্টা ব্লগিং এর তেজ আত্মপ্রকাশ করিবেই করিবে। কেহ কেহ বলেন শুনিয়াছি, আচ্ছা, যাহাদের লেখার জ্বালা, তাহাদের কথা না হয় নাই ধরিলাম, কিন্তু যাঁদের সে জ্বালা নাই, তেমন সব ভদ্রলোকেই বা কি সুখে ব্লগ ছাড়িয়া পলায়ন করেন? তাঁরা বাস করিতে থাকিলে ত ব্লগিঙের এত দুর্দশা হয় না!
কিন্তু থাক এ-সকল বাজে কথা। ব্লগে যাই—দু’ঘন্টার মধ্যে এমন আরও ত দু’তিনখানা ওয়েব সাইট পার হইতে হয়। কোন সাইটে দেখি কোন নায়িকা কাহার সহিত ভাগিল, কাহার সংসার পুড়িলো, কে মা হইতে চলিলো , এইসব খবর লইতেই সময় যায়, কিন্তু আসল যা কাজ — দরকারী মেইল করা, ব্লগে যাইয়া কমেন্ট করা —এ-সকল দরকারী কাজ করিবার ফুরসতই মেলে না।
*জনৈক ব্লগারের ডায়েরি হইতে নকল। তার আসল নামটা কাহারও জানিবার প্রয়োজন নাই, নিষেধও আছে। ব্লগ নামটা না হয় ধরুন, ন্যাড়া।
আমাদের ব্লগের একটি ছেলের নিক সঙ্গে মাঝে মাঝেই ব্লগে দেখিতাম । তার নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের চেয়ে সে বয়সে অনেক বড়। সব সময় ব্লগে আসিতো , ছাগু খেদাইতো। মুক্তিযুদ্ধের কথা, প্রগতিশীল ধ্যান ধারনার কথা, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখিতো । কবে যে সে প্রথম ব্লগে আসিয়াছিলো, এ খবর আমরা কেহই জানিতাম না—সম্ভবতঃ তাহা প্রত্নতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয়—আমরা কিন্তু তাহার ব্লগটিকেই চিরদিন দেখিয়া আসিয়াছি। তাহার অন্য ব্লগে যাইবার ইতিহাসও কখনো শুনি নাই, ফেসবুকে যাইবার খবরও কখনো পাই নাই। মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ-মা ভাই-বোন কেহই ছিল না; ছিল শুধু শহরের একপ্রান্তে একটা প্রকাণ্ড আম-কাঁঠালের বাগান, আর তার মধ্যে একটা পোড়ো-বাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। খুড়ার কাজ ছিল, ভাইপোর নানাবিধ দুর্নাম রটনা করা—সে গাঁজা খায়, সে গুলি খায়, এমনি আরও কত কি! তাঁর আর একটা কাজ ছিল বলিয়া বেড়ানো—ঐ বাগানের অর্ধেকটা তাঁর নিজের অংশ, নালিশ করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র। অবশ্য দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা-আদালতে নালিশ করিয়া নয়—উপরের আদালতের হুকুমে। কিন্তু সে কথা পরে হইবে।
মৃত্যুঞ্জয় নিজে রাঁধিয়া খাইত এবং আমের দিনে ঐ আম-বাগানটা জমা দিয়াই তাহার সারা বৎসরের খাওয়া-পরা চলিত এবং ভাল করিয়াই চলিত। ব্লগে যেদিন দেখা হইয়াছে, সেই দিনই দেখিয়াছি মৃত্যুঞ্জয় সুন্দর সুন্দর লেখা লিখিয়া তাহা ব্লগে উপস্থাপন করিতো। তাহাকে কখনো কাহারও সহিত যাচিয়া আলাপ করিতে দেখি নাই—বরঞ্চ উপযাচক হইয়া কথা কহিতাম আমরাই। তাহার প্রধান কারণ ছিল এই যে, দোকানের খাবার কিনিয়া খাওয়াইতে গ্রামের মধ্যে তাহার জোড়া ছিল না। আর শুধু ছেলেরাই নয়। কত মেয়ে কতবার যে গোপনে তাহার সহিত পিজা হাটে গিয়াছে, শপিং করিয়া বিল ধরাইয়া দিয়াছে তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু ঋণ স্বীকার করা ত দূরের কথা, ছেলে তাহার সহিত একটা কথা কহিয়াছে এ-কথাও কেহ ভদ্র-সমাজে কবুল করিতে চাহিত না — মৃত্যুঞ্জয়ের ছিল এমনি সুনাম।
অনেকদিন মৃত্যুঞ্জয়ের সহিত দেখা নাই। একদিন শোনা গেল সে মর-মর। আর একদিন শোনা গেল, আরেক ব্লগ পাড়ার এক নাস্তিক বুড়া মাল তাহার চিকিৎসা করিয়া এবং তাহার নাস্তিক মেয়ে বিলাসী সেবা করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে যমের মুখ হইতে এ-যাত্রা ফিরাইয়া আনিয়াছে।
অনেকদিন তাহার অনেক লেখা মারিয়া পত্রিকায় দিয়া দিয়েছি নিজের নামে , অনেক সুনাম কামাইয়াছি তাহার কারণে, তাই মনটা কেমন করিতে লাগিল। একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকাইয়া তাহাকে দেখিতে গেলাম। তাহার পোড়ো-বাড়িতে প্রাচীরের বালাই নাই। স্বচ্ছন্দে ভিতরে ঢুকিয়া দেখি, ঘরের দরজা খোলা, বেশ উজ্জ্বল একটি প্রদীপ জ্বলিতেছে, আর ঠিক সুমুখেই তক্তপোশের উপর পরিষ্কার ধপধপে বিছানায় মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে, তাহার কঙ্কালসার দেহের প্রতি চাহিলেই বুঝা যায়, বাস্তবিক যমরাজ চেষ্টার ত্রুটি কিছু করেন নাই, তবে যে শেষ পর্যন্ত সুবিধা করিয়া উঠিতে পারেন নাই, সে কেবল ওই মেয়েটির জোরে। সে শিয়রে বসিয়া পাখার বাতাস করিতেছিল, অকস্মাৎ মানুষ দেখিয়া চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এই সেই বুড়া নাস্তিকের মেয়ে বিলাসী। তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না। কিন্তু মুখের প্রতি চাহিবামাত্রই টের পাইলাম, বয়স যাই হোক, খাটিয়া খাটিয়া আর রাত জাগিয়া জাগিয়া ইহার শরীরে আর কিছু নাই। ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসী ফুলের মত। হাত দিয়া এতটুকু স্পর্শ করিলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।

মৃত্যুঞ্জয় আমাকে চিনিতে পারিয়া বলিল, কে, ন্যাড়া?
বলিলাম, হুঁ।
মৃত্যুঞ্জয় কহিল, ব’সো।
মেয়েটা ঘাড় হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। মৃত্যুঞ্জয় দুই-চারিটা কথায় যাহা কহিল, তাহার মর্ম এই যে, প্রায় দেড়মাস হইতে চলিল সে শয্যাগত। মধ্যে দশ-পনরো দিন সে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়া ছিল, এই কয়েকদিন হইল সে লোক চিনিতে পারিতেছে এবং যদিচ এখনো সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারে না, কিন্তু আর ভয় নাই।
মৃত্যুঞ্জয় কহিলো - ব্লগে যাহারা সকাল সন্ধ্যা মানবতার কথা বলে, ধর্মের কথা বলে, সুশীল ব্লগার - তাহার কেহই তাহাকে দেখিতে আসে নাই। সেই রোগীকে এই বনের মধ্যে একাকী যে নাস্তিকের মেয়েটি বাঁচাইয়া তুলিবার ভার লইয়াছিল, সে কতবড় গুরুভার! দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রূষা, কত ধৈর্য, কত রাত-জাগা! সে কত বড় সাহসের কাজ! কিন্তু যে বস্তুটি এই অসাধ্য-সাধন করিয়া তুলিয়াছিল তাহার পরিচয় যদিচ সেদিন পাই-নাই, কিন্তু আর একদিন পাইয়াছিলাম।
ফিরিবার সময় মেয়েটি আর একটি প্রদীপ লইয়া আমার আগে আগে ভাঙ্গা প্রাচীরের শেষ পর্যন্ত আসিল। এতক্ষণ পর্যন্ত সে একটি কথাও কহে নাই, এইবার আস্তে আস্তে বলিল, রাস্তা পর্যন্ত তোমায় রেখে আসব কি?
বড় বড় আমগাছে সমস্ত বাগানটা যেন একটা জমাট অন্ধকারের মত বোধ হইতেছিল, পথ দেখা ত দূরের কথা, নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যায় না। বলিলাম, পৌঁছে দিতে হবে না, শুধু আলোটা দাও।
সে প্রদীপটা আমার হাতে দিতেই তাহার উৎকণ্ঠিত মুখের চেহারাটা আমার চোখে পড়িল। আস্তে আস্তে সে বলিল, একলা যেতে ভয় করবে না ত? একটু এগিয়ে দিয়ে আসব?
মেয়েমানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভয় করবে না ত? সুতরাং মনে যাই থাক, প্রত্যুত্তরে শুধু একটা ‘না’ বলিয়াই অগ্রসর হইয়া গেলাম।
সে পুনরায় কহিল, বন-জঙ্গলের পথ, চারিদিকে নানান দলের ক্যাডার থাকতে পারে , ছাগু থাকিতে পারে, পুলিশ থাকিতে পারে - একটু দেখে দেখে যেয়ো।
সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়া উঠিল, কিন্তু এতক্ষণে বুঝিলাম উদ্বেগটা তাহার কিসের জন্য এবং কেন সে আলো দেখাইয়া এই বনের পথটা পার করিয়া দিতে চাহিতেছিল। হয়ত সে নিষেধ শুনিত না, সঙ্গেই যাইত, কিন্তু পীড়িত মৃত্যুঞ্জয়কে একাকী ফেলিয়া যাইতেই বোধ করি তাহার শেষ পর্যন্ত মন সরিল না।
এই প্রসঙ্গে অনেকদিন পরের একটা কথা আমার মনে পড়ে। এক ব্লগার কে দেখিতাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসিলেই কহিতো - " দেশের এত খারাপ অবস্থা, শেয়ার বাজার ধ্বংস হইয়া যাইতাছে, সকল টাকা লুটপাট হইয়াছে, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হইয়াছে, হলমার্ক টাকা মারিয়া দিয়াছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উন্নতি হয় নাই, আর তুমি আসিয়াছো বিচার নিয়া। এসব হুজুর দের বিচারের যাহারা দাবী করিতেছে সকলেই নাস্তিক, তাহাদের লিস্ট করিতেছি, সময় হইলে ব্যবস্থা লইবো " ।
কিন্তু দুঃখটা তাঁহার তুচ্ছ করিয়া দেখানও আমার উদ্দেশ্য নহে। কিংবা তাহা খাঁটি নয় এ কথা বলাও আমার অভিপ্রায় নহে। কিংবা একজনের ব্যবহারেই তাহার চূড়ান্ত মীমাংসা হইয়া গেল তাহাও নহে। কিন্তু এমন আরও অনেক ঘটনা জানি, যাহার উল্লেখ না করিয়াও আমি এই কথা বলিতে চাই যে, দেশে কাঠালপাতার সংকট অচিরেই বাড়িবে।
প্রায় মাস-দুই মৃত্যুঞ্জয়ের খবর লই নাই। যাঁহারা আইটি পল্লী দেখেন নাই, কিংবা ওই ফেসবুকের জানালায় মুখ বাড়াইয়া দেখিয়াছেন, তাঁহারা হয়ত সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিবেন, এ কেমন কথা? এ কি কখনো সম্ভব হইতে পারে যে অত-বড় অসুখটা চোখে দেখিয়া আসিয়াও মাস-দুই আর তার খবরই নাই? তাঁহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, এ শুধু সম্ভব নয়, এই হইয়া থাকে। একজনের বিপদে পাড়াসুদ্ধ ঝাঁক বাঁধিয়া উপুড় হইয়া পড়ে, এই যে একটা জনশ্রুতি আছে, জানি না তাহা সত্যযুগের পল্লীগ্রামের ছিল কি না, কিন্তু একালে ত কোথাও দেখিয়াছি বলিয়া মনে করিতে পারি না। তবে তাহার মরার খবর যখন পাওয়া যায় নাই, তখন সে যে বাঁচিয়া আছে, এ ঠিক।
এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন কানে গেল, মৃত্যুঞ্জয়ের সেই বাগানের অংশীদার খুড়া ফেসবুকে তোলপাড় করিয়া বেড়াইতেছে যে, গেল—গেল, দেশটা এবার রসাতলে গেল! সুশীল ব্লগার বলিয়া সমাজে আর তাঁর মুখ বাহির করিবার জো রহিল না—অকালকুষ্মাণ্ডটা একটা নাস্তিকের মেয়ে নিকা করিয়া ঘরে আনিয়াছে। আর শুধু নিকা নয়, তাও না হয় চুলায় যাক, তাহার হাতে ভাত পর্যন্ত খাইতেছে! দেশে যদি ইহার শাসন না থাকে ত বনে গিয়া বাস করিলেই ত হয়!
তখন ছেলে-বুড়ো সকলের মুখের ঐ এক কথা,—অ্যাঁ—এ হইল কি? কলি কি সত্যই উলটাইতে বসিল!

খুড়া বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, এ যে ঘটিবে, তিনি অনেক আগেই জানিতেন। তিনি শুধু তামাশা দেখিতেছিলেন; কোথাকার জল কোথায় গিয়া মরে! নইলে পর নয়, প্রতিবেশী নয়, আপনার ভাইপো! তিনি কি ফেসবুকে রিপোর্ট করিতে পারিতেন না? তাঁহার কি ব্লগে পোস্ট দেবার ক্ষমতা ছিল না? তবে কেন যে করেন নাই, এখন দেখুক সবাই। কিন্তু আর ত চুপ করিয়া থাকা যায় না! এ যি সুশীল সমাজের নাম ডুবিয়া যায়! আস্তিকদের মুখ পোড়ে !
তখন আমরা সুশীল সকল লোক মিলিয়া যে কাজটা করিলাম, তাহা মনে করিলে আমি আজও লজ্জায় মরিয়া যাই। খুড়া চলিলেন সুশীল-বংশের অভিভাবক হইয়া, আর আমরা দশ-বারোজন সঙ্গে চলিলাম আস্তিকের বদন দগ্ধ না হয় এইজন্য।
মৃত্যুঞ্জয়ের পোড়ো-বাড়িতে গিয়া যখন উপস্থিত হইলাম তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হইয়াছে। মেয়েটি ভাঙ্গা বারান্দায় একধারে ব্লগ লিখিতেছিল, অকস্মাৎ লাঠিসোঁটা হাতে এতগুলি লোককে উঠানের উপর দেখিয়া ভয়ে নীলবর্ণ হইয়া গেল।
খুড়ো ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখিলেন, মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে। চট করিয়া শিকলটা টানিয়া দিয়া, সেই ভয়ে মৃতপ্রায় মেয়েটিকে সম্ভাষণ শুরু করিলেন। বলা বাহুল্য, জগতের কোন খুড়া কোনকালে বোধ করি ভাইপোর স্ত্রীকে ওরূপ সম্ভাষণ করে নাই। সে এমনি যে, মেয়েটি নাস্তিকের মেয়ে হইয়াও তাহা সহিতে পারিল না, চোখ তুলিয়া বলিল, বাবা আমারে বাবুর সাথে নিকে দিয়েচে জানো!
খুড়া বলিলেন, তবে রে! নাস্তিকের আবার নিকে ! ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং সঙ্গে সঙ্গেই দশ-বারোজন বীরদর্পে হুঙ্কার দিয়া তাহার ঘাড়ে পড়িল। কেহ ধরিল চুলের মুঠি, কেহ ধরিল কান, কেহ ধরিল হাত-দুটো—এবং যাহাদের সে সুযোগ ঘটিল না, তাহারাও নিচেষ্ট হইয়া রহিল না।
কারণ, সংগ্রাম-স্থলে আমরা কাপুরুষের ন্যায় চুপ করিয়া থাকিতে পারি, আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে পারি , টিভিতে টক শো তে রাজা উজির মারিতে পারি এইখানে একটা অবান্তর কথা বলিয়া রাখি। শুনিয়াছি নাকি এ সকল মুক্তমনা পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কি কথা! দেশের সুশীল নামধারী ছাগু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি, যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়। তা সে নর-নারী যাই হোক না কেন।
মেয়েটি প্রথমেই সেই যা একবার আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিল, তারপরে একেবারে চুপ করিয়া গেল। কিন্তু আমরা যখন তাহাকে গ্রামের বাহিরে রাখিয়া আসিবার জন্য হিঁচড়াইয়া লইয়া চলিলাম, তখন সে মিনতি করিয়া বলিতে লাগিল, বাবুরা, আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও, আমি ব্লগের পোস্ট টা দিয়ে আসি।
মৃত্যুঞ্জয় রুদ্ধ-ঘরের মধ্যে পাগলের মত মাথা কুটিতে লাগিল, দ্বারে পদাঘাত করিতে লাগিল এবং শ্রাব্য-অশ্রাব্য বহুবিধ ভাষা প্রয়োগ করিতে লাগিল। কিন্তু আমরা তাহাতে তিলার্ধ বিচলিত হইলাম না। স্বদেশের মঙ্গলের জন্য সমস্ত অকাতরে সহ্য করিয়া তাহাকে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া লইয়া চলিলাম।
চলিলাম বলিতেছি, কেননা আমিও বরাবর সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু কোথায় আমার মধ্যে একটুখানি দুর্বলতা ছিল, আমি তাহার গায়ে হাত দিতে পারি নাই। বরঞ্চ কেমন যেন কান্না পাইতে লাগিল। সে যে অত্যন্ত অন্যায় করিয়াছে এবং তাহাকে গ্রামের বাহির করাই উচিত বটে, কিন্তু এটাই যে আমরা ভাল কাজ করিতেছি, সেও কিছুতে মনে করিলাম না। কিন্তু আমার কথা যাক।
আপনারা মনে করিবেন না, আইটি পল্লী তে উদারতার একান্ত অভাব। মোটেই না। বরঞ্চ বড়লোক হইলে আমরা এমন সব ঔদার্য প্রকাশ করি যে, শুনিলে আপনারা অবাক হইয়া যাইবেন।
এই মৃত্যুঞ্জয়টাই যদি না তাহার হাতে ভাত খাইয়া অমার্জনীয় অপরাধ করিত, তা হইলে ত আমাদের এত রাগ হইত না। আর আস্তিক ছেলের সঙ্গে নাস্তিক মেয়ের নিকা—এ ত একটা হাসিয়া উড়াইবার কথা! কিন্তু কাল করিল যে ঐ ভাত খাইয়া! হোক না সে আড়াই মাসের রুগী, হোক না সে শয্যাশায়ী! কিন্তু তাই বলিয়া ভাত! লুচি নয়, সন্দেশ নয়, পাঁঠার মাংস নয়! ভাত খাওয়া যে অন্ন-পাপ! সে ত আর সত্য সত্যই মাপ করা যায় না! ভাত খাইয়া তাহারা অবাধ মেলামেশা করিবে - হউক স্বামী স্ত্রী কিন্তু এতে তো ইসলাম ধ্বংস হইবে। তাহারা ঘরে বসিয়া হিন্দি টিভি চ্যানেল দেখুক - উহাতে আপত্তি নাই কিন্তু তাই বলিয়া মাথায় কাপড় না দিয়া চলিবে ?
এই ত ইহারই কিছুদিন পরে, মাঝার মুখার্জি উরফে লুঙ্গি মাঝার মনের বৈরাগ্যে যখন নতুন করিয়া ফিরিয়া আসিলেন, তখন নিন্দুকেরা কানাকানি করিতে লাগিল যে, নাস্তিক টা আবার কী না কী বলিয়া ফেলে । সবাইকে অবাক করিয়া লুঙ্গি মাঝার তাহার পুর্বরুপ ঝাড়িয়া ফেলিয়া যেদিন ল্যাঞ্জা বাহির করিয়া ম্যা ম্যা করিতে লাগিলো সেদিনই বুঝিলাম ইহারা মরিয়া গেলে পঁচিয়া যায়, বাঁচিয়া থাকিলে ছাগু হয়।
কিন্তু যাক। ছাগুত্ত্বের কাহিনী আমাদের অনেক আছে। যুগে যুগে সঞ্চিত হইয়া প্রায় প্রত্যেকে বুদ্ধিজিবির দ্বারেই স্তূপাকার হইয়া উঠিয়াছে। এই বঙ্গের অনেক পল্লীতে অনেকদিন ঘুরিয়া গৌরব করিবার মত অনেক বড় বড় ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়াছি। চরিত্রেই বল, ধর্মেই বল, সমাজেই বল, আর বিদ্যাতেই বল, শিক্ষা একেবারেই পুরা হইয়া আছে; এখন শুধু নাস্তিক বলিয়া কষিয়া গালিগালাজ করিতে পারিলেই দেশটা উদ্ধার হইয়া যায়।

বছর খানেক গত হইয়াছে। ছাগুর উৎপাত সহ্য করিতে না পারিয়া ব্লগিং এ ইস্তফা দিয়া ফেসবুকে ফিরিয়াছি। একদিন ফেসবুকে নানান প্রোফাইল ঘাটিতে ঘাটিতে হঠাৎ দেখি মৃত্যঞ্জয়ের ছবি। শাহবাগে বসিয়া শ্লোগান দিতেছে। কপালে "রাজাকারের ফাঁসি চাই" লেখা কাপড় লাগানো , হাত মুষ্ঠিবদ্ধ। কে বলিবে এ আমাদের সেই মৃত্যুঞ্জয়! ধীর স্থির ছেলে এরই মধ্যেই জাত দিয়া একেবারে পুরাদস্তুর আন্দোলনকারী হইয়া গেছে। তৎক্ষণাৎ তাহাকে ফ্রেন্ড রিকোসেট পাঠাইলাম।
আমিও শুনিয়াছিলাম শাহবাগে একদল ব্লগার রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে আন্দোলন শুরু করিয়াছে। আশে পাশে অনেকেই গিয়াছে, তদ্যাপি আমি যাই নাই। কী দরকার বাবা !!! গা বাঁচাইয়া চলিতে পারিলেই তো হইলো। নাম ধাম হইয়াছে, টক শোতে যাইতেছি , এখন এই আন্দোলন করিয়া আবার কী না কী ঝামেলায় পড়িতে হয়। আমি ফেসবুকে বসিয়া বসিয়া আন্দোলনকারী দের স্ট্যাটাস দেখিলেই "সাথে আছি" কমেন্ট করিয়া আমার দায় সারিতেছি।
ক্রমান্বয়ে এমন অবস্থা হইলো যে শাহবাগে না যাইয়া থাকা সম্ভব হইলো না। বাধ্য হইয়া একদিন আমিও সেখানে গমন করিলাম। ধীরে ধীরে ভীড়ের ভিতর ঢুকিতে লাগিলাম। অজস্র ছেলে বুড়ো সমবেত হইয়াছে। তারুণ্যের সাথে মিশিয়াছে ষাটোর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিগণ। কেহ শ্লোগান দিতেছে , কেহ বাদ্য বাজাইয়া গান ধরিয়াছে, কেহ মিছিল করিতেছে। এ যেন নবজন্ম হইয়াছে তারুণ্যের । জন্মভুমির প্রতি তাহাদের এরূপ ভালোবাসা , রাজাকার মুক্ত করিবার এমন প্রত্যয় দেখিয়া আমার রক্ত টগবগাইয়া নাচিয়া উঠিলো। ভাবিলাম - এতদিন না আসিয়া চরম ভুলই করিয়াছি। সেই ভীড়ে মৃত্যুঞ্জয় কে খুঁজিতে লাগিলাম।
মৃত্যুঞ্জয় শ্লোগান দিয়া কাহিল হইয়া ফুটপাতের উপর বসিয়া ছিলো। চেহারা মলিন, কালো হইয়া গিয়াছে রোদে পুড়িয়া, রাত্রিতে না ঘুমাইয়া চোখের নিচে কালো দাগ পড়িয়াছে। ভাবিতেছিলাম যে, দেখিয়া কে বলিবে এই সেই মৃত্যুঞ্জয়। কিন্তু আমাকে সে খাতির করিয়া বসাইল। বিলাসী পাশের দোকানে জল কিনিতে গিয়াছিল, আমাকে দেখিয়া সেও ভারী খুশি হইয়া বার বার বলিতে লাগিল, তুমি না আগলালে সে রাত্তিরে আমাকে তারা মেরেই ফেলত। আমার জন্যে কত মারই না জানি তুমি খেয়েছিলে। কিন্তু আমিতো জানি , সেদিন আমি "আরে কর কী কর কী" বলিয়াই আমার দায়িত্ব পালন করিয়াছি শুধু, কাজের কাজ কিছুই করিনাই।
কথায় কথায় শুনিলাম, আন্দোলন আরম্ভ হইবার দিনই তাহারা এখানে উঠিয়া আসিয়া ক্রমশঃ বাস করিতেছে এবং সুখে আছে। এই ভিড় , কষ্ট , আন্দোলনের মাঝেও তাহারা সুখে যে আছে, এ কথা আমাকে বলার প্রয়োজন ছিল না, শুধু তাহাদের মুখের পানে চাহিয়াই আমি তাহা বুঝিয়াছিলাম।
তাই শুনিলাম, তাহাদের সমাবেশ রহিয়াছে এবং তাহারা সেজন্য প্রস্তুত হইয়াছে, আমিও অমনি সঙ্গে যাইবার জন্য লাফাইয়া উঠিলাম। ছেলেবেলা হইতেই দুটা জিনিসের উপর আমার প্রবল শখ ছিল। এক ছিল সমাবেশ দেখা আর আরেকটা ছিলো শ্লোগান দেয়া। কিন্তু এ পর্যন্ত করা হয় নাই।
আন্দোলনে আসিয়া তাহার সহিতে একাত্ম হওয়ার উপায় তখনো খুঁজিয়া বাহির করিতে পারি নাই, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়কে কাছে পাইয়া আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলাম। সে শাহবাগ আন্দোলনের একজন মস্ত লোক। আমার ভাগ্য যে অকস্মাৎ এমন সুপ্রসন্ন হইয়া উঠিবে, তাহা কে ভাবিতে পারিত? একাত্ম হইয়া গেলাম তাহাদের সহিত।
কিন্তু শক্ত কাজ, এবং ভয়ের কারণ আছে বলিয়া প্রথমে তাহারা উভয়েই আপত্তি করিল, কিন্তু আমি এমনি নাছোড়বান্দা হইয়া উঠিলাম যে, ঘন্টা - খানেকের মধ্যে আমাকে সাগরেদ করিতে মৃত্যুঞ্জয় পথ পাইল না। শ্লোগান শিখাইয়া দিল এবং সাথে মঞ্চের নিকট নিয়া বসাইয়া দিলো।

অবশেষে একদিন আন্দোলনের সহিত মিশিয়া গেলাম। সবাই বলাবলি করিতে লাগিল, হ্যাঁ, ন্যাড়া একজন গুণী লোক বটে। এত দ্রুত আন্দোলনে মিশিয়া যাইতে দেখিয়া সকলে বাহবা দিতে লাগিলো।
শ্লোগানের মাঝে মাঝে চোখাচোখি হইলে বিলাসী একখানা স্মিত হাসি দিতো। আসল কথা হইতেছে আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য একাত্ম হইয়াছি। খাইয়া না খাইয়া দিন-রাত প্রজন্ম চত্বরে পড়িয়া রহিয়াছি।
আমাদের এরূপ অবস্থা যখন চলিতেছে ঐদিকে মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়ো গেল গেল সব গেল বলিয়া কলরব করিতেছে। তিনি সমাবেশ ডাকিয়া সকলকে বুঝাইতে লাগিলেন ইহা নাস্তিক দের মিলনমেলা, শাহবাগে সকল প্রকার খারাপ কাজ হইয়া থাকে। ছেলে-মেয়ে একত্রে মিলামিশা করিতেছে, উহারা গাঞ্জা মদ খাইতেছে । এখানে কেহ ধার্মিক নহে। খুড়োর কথায় কেহ কেহ সায় দিয়া কহিলো - তাহা হইলে শাহবাগ বন্ধ করিতে হইবে বৈকি ! । এরূপ তো চলিতে দেয়া যায়না। দেশ জাতি ধর্ম সব উচ্ছন্নে যাইবে। ৪২ বছর আগের বিষয় নিয়া রাস্তা বন্ধ করিয়া এরূপ তো চলিতে পারে না ।
আন্দোলন আরম্ভ হইবার পর নানা ঝামেলা শুরু হইতে লাগিলো। নানান দলের লোকজন আসিয়া নানা তর্ক করিতো, তাহাদের কথা মানিতে বাধ্য করিবার চেষ্টা করাইতো। এসব দেখিয়া অনেকেই দূরে সরিয়া গিয়াছিলো। মৃত্যুঞ্জয় কে ইহা নিয়া কিছু কহিলে বলিতো - করুক গে , আমাদের তো অত কিছু চিন্তা করিবার দরকার নাই।
ওদিকে মৃত্যুঞ্জয় এর খুড়ো "নাস্তিক নাস্তিক" বলিয়া তোলপাড় করিয়া ফেলাইতে লাগিলো। দ্বারে দ্বারে ঘুরিতে লাগিলো ইহাদের কে নিবৃত্ত করিবার জন্য। শুনিলাম নাস্তিকদের তালিকা করিয়া তিনি সমাজের দ্বারে দ্বারে বিলি করিতে লাগিলেন। তাহার প্রথমেই ছিলো মৃত্যুঞ্জয় এর নাম। মৃত্যুঞ্জয় নাস্তিক বিবাহ করিয়া নাস্তিক হইয়া গিয়াছে - এই যুক্তিতে তাহার নাম রহিয়াছে তালিকায়। সকলে তাহাকে এমতাবস্থায় গা ঢাকা দিয়া থাকিতে উপদেশ দিলো।
সকলের উপদেশ অগ্রাহ্য করিয়া মৃত্যুঞ্জয় বরাবরের মতন শাহবাগে আসিতো, এসব তালিকা কে সে অগ্রাহ্য করিতো। সকলের সাথে গলা মিলাইয়া শ্লোগান ধরিতো। বিলাসী তাহাকে নিষেধ করিলেও সে শুনিতো না, কহিতো - আমার রক্তে সহিত মিশিয়া রহিয়াছে, তুমি বুঝিবা না। বিলাসী বুঝিতো - সমাজে , রাষ্ট্রে তাহার খুড়োর ন্যায় লোকের কদর বেশী। তাহার কথা সকলে শুনিবে। বিলাসী জানিতো - সবকিছু নস্টদের অধিকারে চলিয়া গিয়াছে। ইহারা ধর্মের নামে , সমাজের নামে তারুন্য কে দমিয়ে রাখিতে চায়, সত্য কে চাপা রাখিয়া দিতে চায়। ইহারা কুৎসা রটাইয়া সমাজ হইতে একদা বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিলো তাহাদের দুজন কে। খুড়োদের ন্যায় কালসাপের পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।
তবুও মৃত্যুঞ্জয় থামিয়া থাকিতে পারে নাই। একদা সে বরাবরের মতন আন্দোলনে আসিয়াছে, সেথা হইতে তাহার বাড়ীতে যাইয়বার পথে তাহাকে পুলিশ ধরিয়া লইয়া যায়। পুলিশ ধরিয়া তাহার কম্পিউটার, মোডেম সকল কিছু জব্দ করিয়া লইয়া যায়। তাহাকে রিমান্ডে লইয়া যায় পুলিশ।
পরদিন শুনিলাম বিলাসী তাহার মুক্তির জন্য তোরজোড় করিতেছে । অনেকের সহিত দেখা করিয়া যাহ সম্ভব চেষ্টা করিতেছে। তাহাদের অভাবের সংসার । যাহা ছিলো সব বিক্রি করিয়া মৃত্যুঞ্জয় এর মুক্তির জন্য উকিলের পিছনে টাকা ঢালিতেছে।
মৃত্যুঞ্জয়কে পুলিশ ধরিবার পর হইতে আমরাও নিরাপদ দূরত্বে চলিয়া আসিয়াছি। এখন আর শাহবাগে যাইনা। ফেসবুকে বসিয়া আমরা মৃত্যুঞ্জয় এর মুক্তি চাহিয়া স্ট্যাটাস দিতেছি, ইভেন্ট করিতেছি। ব্লগে ব্লগে রক্ত গরম করিয়া পোস্ট দিতেছি কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ের মুক্তির ব্যাপার সম্মুখে আসিলেই পলায়ন করিতে দ্বিধা করিতেছি না।
খুড়ামশাই ষোল আনা বাগান দখল করিয়া অত্যন্ত বিজ্ঞের মত চারিদিকে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ওর মত নাস্তিকের যদি সাজা না হয়, ত হবে কার? পুরুষমানুষ অমন একটা ছেড়ে দশটা করুক না, তাতে ত তেমন আসে-যায় না—না হয় একটু নিন্দাই হ’তো। কিন্তু, নাস্তিক কে বিয়ে করতে গেলি কেন ? নিজে জেলে গেলো , আমার পর্যন্ত মাথা হেঁট করে গেল।
গ্রামের লোক একবাক্যে বলিতে লাগিল, তাহাতে আর সন্দেহ কি! নাস্তিক -পাপ! বাপ্‌রে! এর কি আর প্রায়শ্চিত্ত আছে!
যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবী হইলো আস্তিক নাস্তিক প্রমাণ করিবার আন্দোলন।
[সমাপ্ত। ইহা একটি স্যাটায়ার। জিবিত বা মৃত ব্যাক্তি বা কোন ঘটনার সহিত ইহার মিল খুঁজিয়া পাইলে তাহা নিতান্তই কাকতাল এবং পাঠকের নিজস্ব ভাবনা । তাহার জন্য লেখক কে দায়ী করা যাইবে না]

প্রথম প্রকাশঃ আমরাবন্ধু , এপ্রিল ১, ২০১৩



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন