বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০১০

একটি বিষন্ন চিঠি - মা'কে

মা,

আমার সালাম ও দোয়া নিও। কেমন আছো তুমি ? কতদিন তোমায় দেখিনা !!! কতদিন তোমায় মা বলে ডাকিনা !!! সেই যে ঐ তারার দিকে যাত্রা করেছিলে, তারপর একটি মুহুর্তও তোমায় না ভেবে থাকতে পারিনি।

সেই ৮৭ এর মার্চের এক সকালে তুমি আমাদের ফেলে পাড়ি জমালে নক্ষত্রের পানে। ২২ টি বছর হয়ে গেল মা, তোমায় ডাকিনা, কোনদিন ডাকতেও পারব না। জানো মা, আমি ভুলেই গেছি, কি ভাবে তোমাকে ডাকতাম !! এখন মা বলে ডাকতে গেলে খুব সংকোচ লাগে। তবু ও তো আমি কিংবা আপা তোমাকে মা বলে কিছু দিন ডাকতে পেরেছি, মুনিয়া তো তা পারেনি। ও, মা ডাক শিখতে না শিখতেই তুমি চলে গেলে। মুনিয়া তো জানেই না মা ডাক কি জিনিস , মা কি জিনিস !!!

তুমি যাবার দিন খুব কেঁদেছিলাম। খুব কেঁদেছিলাম, তুমি আর আসবে না  ভেবে। আমার কিশোর মন আর কিছু বুঝেনি তখন। মা, আমি এখনও কাঁদি তোমার জন্য। তুমি ফিরে আসবে না , শুধু সেই দুঃখে না, তোমার হারানোর ব্যাথা যে কত কষ্টের, তোমায় ছাড়া জীবন চলা যে কত ব্যাথার , আমি প্রতিটি ক্ষনে আমি উপলব্ধি করি এখনও। তাই তো ২২ বছর পার হলেও মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা, তুমি শুয়ে আছো সাদা চাদরে মুড়ে, মাথার কাছে আমি ..........

প্রতিটা ক্ষন মনে হত মাথার উপর কোন ছাদ নেই, ঝড় বৃষ্টি আসলে সামলাবে কে, তীব্র দাবদাহ থেকে রক্ষা করবে কে!!! কিন্তু দেখ, তারপর কত ঝড় গেল , তিন ভাই বোন জড়সড় হয়ে সে ঝড়ের মুখোমুখি হলাম। মা, তুমি ছাড়া যে জীবন, সে জীবন কি ও কত প্রকার জেনেছি। বুঝলাম, মাথার উপরে কি বিশাল ছাদ হয়ে ছিল তোমার শাষন আর ভালোবাসা আর তুমি। কি ভাবে তুমি তোমার আঁচলের নিচে লুকিয়ে রেখে তোমার কোলের ভিতর জড়িয়ে রেখে আমাদেরকে সব ঝড় হতে রক্ষা করেছ। জানো মা, তুমি চলে যাবার পর আপা তো নিয়তির সাথে অভিমান করে খাওয়া দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল।

২২ বছর হয়ে গেল তারার সাথে তোমার বসবাস তবু আজো তুমি আমাদের কাছে সেই তুমিই আছো। তোমার ছবির মত স্থির হয়ে আছো তুমি। এখন তোমার ছবির দিকে তাকালে আমাকে আমি সেই ১০ বছরের কিশোরের চেহারায় দেখি। খুব চিকন ছিলাম বলে তোমার আফসোসের সীমা ছিল না, কত চিন্তা ছিল আমারে নিয়ে । ঐ শরীর নিয়ে আমি কি করে বড় হব, আমি কি মানুষ হব নাকি , কত দুঃচিন্তায় না কেটেছে । তুমি দেখে যেতে পারলে না মা, আমি কত বড় হয়েছি। মানুষ হয়তো এখনও হতে পারিনি। আর সবার মত আমিও মানবিক গুন গুলো তুলে রেখে দিয়ে চোখ বুজে থাকি মা। তোমার মত দয়ালু হতে পারিনি , কোন ফকীর কে তুমি দরজা থেকে ফিরাও নি আর আমি কোন ফকীর কে ভিক্ষা দেই না। তুমি নানাবাড়ী যাবার সময় গ্রামের গরীব লোকদের জন্য বস্তা ভরে শীতের কাপড় নিয়ে যেতে নিজের টাকায় কিনে, আমি একটা কাপড়ও কাউকে দান করিনা।

তুমি কত শখ করেছিলে আপার এস এস সি পরীক্ষা দেখবে, কিন্তু কি নিষ্ঠুর নিয়তি, তোমাকে দেখতে দিল না। আপার এস এস সি পরীক্ষার ঠিক ৫ দিন আগেই তুমি হারিয়ে গেলে পৃথিবী থেকে। আপা এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিল ঠিকই। তুমি কি দেখতে পেরেছিলে মা, উপর থেকে ? আপা এখন কত বড়, তোমার থেকে ও বড় হয়ে গেছে। আমি এখন তোমার বয়সী। মুনিয়া অনেক বড় হয়ে গেছে মা। মা, তুমি মারা যাবার আগে আমি শাহ আলী (রঃ) মাজারে গেছিলাম। যাবার আগে তুমি বলেছিলে, তোমার জন্য দোয়া করতে যেন খোদাতায়ালা তোমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যায় কিন্তু আমি তো সেই দোয়া করি নাই, তোমার সুস্থতার জন্য দোয়া করেছিলাম। তবুও তুমি চলেই গেলে!

তুমি বেঁচে থাকলে তোমার চুলে হালকা পাক ধরতো। নাতী নাতনী দের নিয়ে তোমার সময় কাটতো। আমার জন্য অপেক্ষা করতে বাসায়। আমি অফিস থেকে ফিরে সোজা তোমার কোলে মাথা রেখে শুতে পারতাম। এখন আমি ফিরি শুন্য খা খা বাসায়। নিঃশব্দতা যেখানে গ্রাস করে একাকিত্ব কে। আজো আমি তোমায় অনুভব করি আমার স্বপ্নে কিংবা কল্পনায়। তোমাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট এতদিনেও একটুও ম্লান হয়নি মা। তুমি হারা জীবনের কষ্টে আমি কাঁদি রাতে বালিশে মুখ গুজে, কোথাও মা'এর ভালোবাসা দেখলে, এমনকি নাটক কিংবা সিনেমায় দেখলেও ভিতর টা মোচড় দিয়ে উঠে, কান্না বের হয়ে আসে জলোচ্ছাসের মত। কান্না লুকাই সবার কাছ থেকে।

জানো মা, আজও আমাদের ভাই বোনের আড্ডার প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে তুমি থাকো। তোমার শাষন, তোমার আদর, তোমার কথাবার্তা গুলো ঘুরে ঘুরে আসে আমাদের আড্ডার মধ্যে। কতটা জীবন্ত এখনও তুমি আমাদের মানস নেত্রে, সেটা কেউ বুঝবেনা।

তুমি ছাড়া এই যে বেঁচে থাকা, এটাকে কি বেঁচে থাকা বলে নাকি আজন্ম আভিশাপ ??

আমায় ক্ষমা করো।

ভালো থেকো।

ইতি
................

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন