পশ্চিমের আকাশ সেজেছে লাল সিদুর রঙ দিয়ে, সেদিনের মত সূর্যের বিদায়ের প্রস্তুতি সারা আকাশ জুড়ে। একটু পর উঠবে সন্ধ্যা তারা। তারপর নামবে রাত্রির নিকষ অন্ধকার। আকাশে এক এক করে জ্বলে উঠবে তারা। নিলাকাশ তখন সাজবে অন্ধকারের মাঝে তারার ঝিলিমিলি মিটিমিটি আলোয়। পাখিদের সারাদিনের ব্যাস্ততা সেরে বাসায় ফেরার পালা। গোধুলী বেলা - দিনের আলো আর রাতের অন্ধকারের মাঝের এই সময় টা বড়ই আদ্ভুত লাগে বাবুর কাছে। সময় পেলে সে এই সময় টা উপভোগ করে। একা একা কবিতা আবৃত্তি করে.........
...........বাবু চারতলায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসার বারন্দায় সে সময় বসে বাইরে দেখছিল। তার বেড রুমের সাথে লাগোয়া এই বারান্দা টা। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত টানা গ্রীল দেয়া বারান্দায়। এই বাসায় ভাড়াটে হিসাবে উঠেছে আজ দুই বছর হল। তিন বেড রুম, ড্রয়ইং, ডাইনিং তিন বারান্দা নিয়ে তার এই ১২০০ বর্গফুটের বাসা। সময় পেলেই বাবু এই বারান্দায় এসে বসে। এই বারান্দা থেকে তাদের সেই পুরোনো বাড়ী যাবার রাস্তা দেখা যায়। সেই জন্যই এই বারান্দা টা বাবুর এত পছন্দ। নিচে বাচ্চাদের খেলা শেষ করে বাসায় যাবার প্রস্তুতি, ডাকা ডাকি, মানুষের অন্ত হীন কথা। বাদাম ওয়ালা "বাদাম বাদাম" বলে হাক ছাড়তে ছাড়তে চলে গেল পাশের রাস্তা দিয়ে । বাবু তখন তাদের পুরোনো বাড়ী তে যাবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল, ভাবছিল তার ফেলে আসা দিন গুলোর কথা। এই বারান্দায় দাড়ালে ই তার সে সব দিনের কথা মনে পড়ে যায়। কত না কষ্টে কেটেছে তাদের জীবন। সুখের জীবন তারপর বাবা মা মারা যাবার স্মৃতি । ঝড়ে ভেঙে পড়া সংসারে তাদের টিকে থাকার লড়াই , তারপর আত্মীয়দের সাথে তার বেয়াদবি,, বড় বোনের চাকরি, বিয়ে , তারপর আস্তে আস্তে আবার মাথা উচু করে দাড়ানো।
মুনিয়ার বিয়ের পর তাদের নিজেদের বাড়ী টা ভাড়া দিয়ে চলে আসে এই বাড়ীতে বাবু। মুনিয়ার বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর। বাবু বি. কম পাস করার আগেই চাকরী তে ঢুকে গেছিল। চাকরী করতে করতেই তার ডিগ্রী পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। কলেজের মধ্যে সর্বোচ্চ মার্কস নিয়ে বি কম পাস করেছিল বাবু। তার কষ্ট করে ফরম ফিলাপের মর্যাদা সে রেখেছে। তারপর চাকরী করেই একাউন্টিং এ মাস্টার্স পাস করেছে দ্বীতিয় শ্রেনীতে, তারপর একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এম বি এ ডিগ্রী নিয়েছে। এর মধ্যে বাবু তাদের পুরোনো বাড়ী টা ঠিক করেছিল। টাকা জমিয়ে নতুন করে পুরো বাড়িটা রিপেয়ারিং করেছে, নতুন করে গ্রীল রঙ করেছে, ভাঙা বাড়ীতে কি আর ছোট বোনের বিয়ে দেবে? মুনিয়া অনেক বড় হয়ে গেছে , ওর বিয়ের জন্য চিন্তা। ছোট বোনের বিয়ের জন্য আবার দেড় লাখ টাকা ও জমিয়েছে বাবু। এসব করতে গিয়ে নিজের দিকে তাকানোর অবস্থা ছিল না বাবুর। চাকরী করে কোন দিন সে ভালো জায়গা থেকে শার্ট কিনে নাই, সব সময় ঢাকা কলেজের পাশ থেকে শার্ট কিনে পড়তো, বাটার একটা জুতা দিয়ে চালিয়েছিল ৫/৬ বছর। এরকম করে খুব ছিপ ছিপে প্রথম চাকরীর জীবন টা কাটিয়েছে বাবু।
ওদিকে মিতার প্রথম সন্তান উপলক্ষ্যে মিতা চাকরী টা ছেড়ে দেয়। কারন তার চাকরী টা ছিল অস্থায়ী, মাতৃত্ব কালীন ছুটি ছিল না। প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা হয়ে ছিল , সন্তান হবার পর এসে যোগাযোগ করলে আবার হয়তো চাকরী টা ফিরে পাবে। তার দরকার হয় নাই। মিতার প্রথম সন্তান হয়েছে মেয়ে। হবার পর পরই সে ঢাকার একটি প্রাইভেট ব্যাংক থেকে চাকরীর অফার পায়। বাবু, সায়েমের বুদ্ধিতে সে জয়েন করে সেই ব্যাংকে। মিতা আগে যেখানে চাকরী করতো, সেখানে তার ডিপার্টমেন্টের বস মিতার কাজ দেখে খুবই খুশী ছিল। সেই বস সেই প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করে এবং মিতা কে অফার দেয় সেখানে জয়েন করার। মতা জয়েন করে সেখানে। এখন মিতা তার কাজ দিয়ে সবাইকে খুশী করতে পেরেছে , এম বি এ করেছে প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে। এখন সে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার। খুব ভালো বেতন । সায়েম সাহেব ও একটা প্রাইভেট অফিসে ডি জি এম। ভালো বেতন, অফিস থেকে গাড়ী পেয়েছে। মিতা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে মিতা ফ্ল্যাট কিনছে পল্লবী তে । স্বামী সন্তান নিয়ে মিতার সংসার ।
তিন বছর আগে মুনিয়ার বিয়ে দিয়েছে খুব ধুম ধাম করে। পাত্র মুনিয়ার পছন্দের। আগে থেকে পরিচয় ছিল তাদের। তার সেই চাচা, বিপদের দিনে যিনি এগিয়ে এসেছিলেন , মুনিয়ার বিয়েতে ১০ ভরি স্বর্নের অলংকার দিয়েছে। তারা মামা খালা রা সব ভুলে শরীক হয়েছিল বিয়েতে। মিতা , বাবু ও আপন আগের কথা সব ভুলে আপন করে নিয়েছিল সবাইকে। বাবুর দেড় লাখ আর মিতার দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে বিয়েতে। মুনিয়া শ্বশুড়, শাশুড়ী নিয়ে ভালোই আছে শ্বশুড় বাড়ীতে। তার স্বামী টুক টাক ব্যবসা করে কম্পিউটার এর দোকান, সাথে সাইবার ক্যাফে - এই নিয়ে চলে যাচ্ছে তাদের সংসার। শুধু মুনিয়া লেখা পড়া বেশী শিখলো না। তিনবার চেষ্টা করেও এইস এস সি পরীক্ষা টা পাস করতে পারলো না। একটা কষ্ট রয়ে গেছে তাই মিতা, বাবুর মনে।
মুনিয়ার বিয়ের পর পরই মিতাও চলে যায় নিজের সংসারে। কত কাল আর বাপের বাড়ী থাকবে ? প্রথমে একটা বাড়ী ভাড়া করে পরে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কিনে মিতা। একা এই টিনের বাসা সামলানো সম্ভব না বলে তাদের সেই বাড়ী টা ভাড়া দিয়ে বাবু এসে উঠে এই বাড়িতে। চার তলা বাড়ীর চার তলায় থাকে বাবু। সাথে এক টা কাজের মেয়ে আর এক কাজিন। একা থাকা কষ্টের বলে কাজিন কে সাথে রেখেছে। এমবিএ পাস করে বাবু আগের চাকরী টা ছেড়ে নতুন চাকরী নিয়েছে।
আগের সেই কষ্টের দিন গুলো নাই কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠে তার অতীতের কথা গুলো, মাঝে মাঝে বাঁধা ভাঙা জোয়ারের মত বের হয়ে আসতে চায় চাপানো কান্না, বুকের ভিতর চাপা দিয়ে রাখা কষ্ট গুলো, অভাবী আর সংযমী জীবনের না পাওয়ার বেদনা গুলো। বাবুর বেডরুমের বিছানার সামনে তাদের পুরো পরিবারের লাস্ট ছবি টা বাধাই করে রাখা। একা একা কখনও এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে। বাবা মা'র আরেকটা ছবি বাধানো মাথার কাছে, সেদিকে চেয়ে একা একা কথা বলে বাবা মা'র সাথে। জীবনের মৌলিক চাহিদা গুলো পুরন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে খেতে সুক্ষ সুক্ষ আবেগ গুলো, কষ্ট গুলোর অনুভুতি গুলো ভোতা হয়ে গেছে । কারো কষ্টের কথা শুনলে বাবুর মনে হয়, ভাতের কষ্ট করনি, কষ্ট তো তাহলে দেখইনি। বাবা মা কে না ডেকে কি দেখেছ দিনের পর দিন, কষ্ট কি বুঝবে ? লড়াই করে টিকে থাকতে হয়নি , জীবনের অর্থ কি জানবে ?
সন্ধ্যা নামে আকাশে। এক এক করে জ্বলে উঠে তারা। নেমে আসে নিরবতার চাদর চারপাশে। বাসার ভিতর মৌনতা খেলা করে বাতাসের সাথে। তারারা কথা বলে আকাশের সাথে। বাতাসেরা লুটোপুটি খায় বারান্দায়। নিরব হয়ে আসে ব্যাস্ত রাস্তা। মাঝে মাঝে দুই একটা পথিকের হেটে যাওয়া, রিকশার টুং টাং আওয়াজ। বাবু বারান্দা ছেড়ে রুমে ঢুকে। কাজিন টা ও নাই, বাড়ী গেছে। কাজের মেয়ে টা তার রুমে দরজা আটকায়ে শুয়ে আছে হয়তো। বসার ঘরে টিভি আছে, গত বছর একটা এল সি ডি টিভি কিনেছে বাবু শখ করে, সেটাও দেখতে ইচ্ছা করছে না এখন। তার রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাতি নিভিয়ে, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেয় তারপর বিছানায় শরীর টা এলিয়ে দেয় বাবু। বড় বোন ফোন করে, কথা বলে মোবাইল টা রেখে দেয় বেড সাইড টেবিল এ। তারপর কম্পিউটার অন করে গান ছাড়ে - ফিরোজা বেগমের কন্ঠে ভেসে আসে "আমি চাঁদ নহি.... চাঁদ নহি আভিশাপ.......শুন্য হ্রদয়ে আজও .... আজও নিরাশার আকাশে করি বিলাপ....."
নতুন করে স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের একাকী ঘরে। জীবন উপন্যাসের নতুন পর্ব শুরু হবে সামনে। সামনে আর কি কি বাঁক আছে জানে না বাবু তবুও স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, স্বপ্নে বেঁচে থাকে বাবু।
উপসংহার : কোন গল্পের উপসংহার থাকে না। কিন্তু আমার এই গল্পের উপসংহার দিলাম। মলিকিউল কয়েক বার বলেছে , দ্রুত কেন যাই, বাতেন জানতে ছেয়েছে, এটা সত্য ঘটনা কি না !!!! এটা কোন গল্প না , তাই মাঝে মাঝে দ্রুত যেতে হয়েছে। যদিও শেষে এসে "অবশেষে তারা সুখে শান্তি তে বসবাস করিতে লাগিল" এর মত গল্পাকারে শেষ হল, কিন্তু শেষ হয়নি মিতা বাবু মুনিয়ার জীবন গল্প। আসলে প্রত্যেকের জীবনটাই তো এক একটা উপন্যাস। সেই বিশাল উপন্যাসের কতটুকু বা আমরা জানি ? সমরেশ মজুমদার "সাতকাহন" লিখেছিলেন, একটা মেয়ের সংগ্রামের কাহীনি ঘিরে। সেখানে হ্যাপি এন্ডিং ছিল না কিন্তু সব চরি্ত্র ছিল কল্পনায় , উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা। আমার গল্পের কোন চরিত্র কোন কল্পনা থেকে উঠে আসা কেউ না। আমাদের তিন ভাই বোনের জীবনে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কথাই গল্প আকারে বলেছি আপনাদের কাছে - জীবনের সাতকাহনে। সেদিনের সেই বাবুই হল আমি - সাঈদ। আমার দুই বোন - মিতা , আর মুনিয়া। আর সাথে বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞতা আমার দুলাভাই সায়েম কে, আমাদের জীবন কে যে অনেক সহজ করে দিয়েছে। আমাদের বাসা ছিল মিরপুর ১১ নং এ। ঐ বাসা টা বিক্রি করে দিয়ে ২ বোনের নামে আরেকটু বড় জায়গা কিনেছি আর আরেকটা বাড়ী সেটা আমার ভাগে পড়েছে, ঐটা ডেভেলপার এর কাছে দিয়েছি।
অনেক ইচ্ছা ছিল আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো কোথাও গল্পাকারে লিখে রাখার। আমার ব্লগে সেটা পেরেছি। আমার ব্লগ কে তাই ধন্যবাদ। শেখ, সুমনা, সৌরভ, রাশেদ আপনারা যে আগ্রহ দেখায়েছেন,উৎসাহ দিয়েছেন তাতে আমি অভিভুত, আপনাদের উৎসাহেই লেখাটা চলায়ে নিয়ে এসেছি এত দুর।
সবাইকে ধন্যবাদ।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন