আরিচা ঘাটে বাবাকে হারিয়ে ছাবিনা যখন হাপুস নয়নে কাঁদছিল আর রিক্সাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা দের নানান অঙ্গ-ভঙ্গি, কুরুচিপূর্ণ কথা বার্তা, আরিচা ঘাটে আটকে পড়া বাসের ড্রাইভার আর হেলপার দের রসালো কথা কে ডিঙ্গিয়ে ঘুরে ঘুরে বাবাকে খুঁজে ক্লান্ত, তখনই অচেনা একজন এসে তার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞাস করে "বাবারে পাইতাছ না মা ?”
সেই সময়ে সেই হাসিটাকে বড় আপনজন মনে করেই জিবনের সবচেয়ে বড় ভুল টা করেছিল ছাবিনা। তার বাবার কাছে নিয়ে যাবে বলে লোকটা ছাবিনা কে নিয়ে লঞ্চে উঠে। লোকটা যেভাবে ছাবিনা কে মা ডেকে সম্বোধন করেছে , নাস্তা করিয়েছে, সেই তাদের ফরিদপুর যাবার লঞ্চে উঠিয়েছে, তাকে অবিশ্বাস করে কেমন করে ? যথাসময়ে লঞ্চ ছাড়ে আরিচা থেকে, পদ্মা পার হয় আস্তে আস্তে। ছাবিনাও বাবা-মা’র কাছে যাবার আশায় দুলতে থাকে লঞ্চের সাথে সাথে। এই লঞ্চ ধরেই তো সে আর তার বাবা নদী পার হয়ে ঢাকায় গেছিল। ছাবিনার ভিতরের কষ্ট টা কমে আসে।
লঞ্চ থেকে দৌলদিয়া ঘাটে নামার পর ছাবিনা কে নিয়ে সেই লোকটা যখন এই বেড়ার আর আধাপাকা বস্তির ভিতরে নিয়ে আসলো , তখনো সে বুঝে নি যে সারা জীবনের জন্য সে এখানে আসতেছে। সরু রাস্তা, তার উপর ধুলা বালি কাদা মিশিয়ে শিশুদের খেলা, মাছি উড়ে গিয়ে তাদের গায়ে পড়ছে, খেলার ফাঁকে তা সরিয়ে খেলে যাচ্ছে আপন মনে। সেই গলির দুপাশ দিয়ে রুগ্ন এক একটা ঘরের গায়ের উপর দিয়ে আরেকটা খাড়া হয়ে থাকা ঘরগুলোর দরজা তে দাঁড়িয়ে থাকা রাত জাগা উৎসুক চোখের দৃষ্টি, কারও ক্লান্ত মুখে মুখ টেপা হাসি। এখানে সাধারনতঃ দিনের বেলা কোন পুরুষ ঢুকে না , তাই পুরুষের পায়ের শব্দে সেই বস্তির মেয়েদের এমন চঞ্চলতা।
সেই সব মেয়েদের কে অগ্রাহ্য করে, সরু গলিটির ভিতর দিয়ে ছাবিনা কে সাহায্যকারী সেই ব্যাক্তিটি হেটে চলেছেন গট গট করে, উদ্দেশ্যঃ একবারে শেষ মাথায় যে ঘরটি আছে, তার পাশের ঘরে যাওয়া। খেলতে থাকা বাচ্চাদের একজন অসাবধানতা বশতঃ এসে তার পায়ের উপর পড়লো, “সর, খানকীর বাচ্চা” বলে তাকে লাথি দিয়ে সরিয়ে আবার গট গট করে হেটে চললো , পিছে পিছে ছাবিনা। আর বস্তির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়েরা দেখছে তাদের এই ব্যবসার নতুন প্রতিযোগী কে কিংবা তাদের মত এই ভাগ্য বরন কারী এই নিষ্পাপ মেয়েটিকে।
সেই থেকে ছাবিনা এই বস্তির একজন। তাকে বিক্রি করে দেয়া লোকটিকে আর দেখেনি সে। হাতের কাছে পেলে হয়তো খুন করতো তাকে। এখানে থাকা আশ-পাশের রহিমা, রোজিনা, শাবান দের মতই সেই এখন পৃথিবীর আদিম পেশায় জড়িত। এখান থেকে তার নিস্কৃতি নাই, মুক্তি নাই। প্রথম যখন তাকে ঠেলে দেয়া হল ক্ষুদার্ত নেকড়ের সামনে, সেই স্মৃতি ভাবলে এখনও কেঁপে কেঁপে উঠে সে। যে পুরুষ এর রুপ দেখেছিল ছাবিনা তার বাবা, ভাই, পাড়ার বন্ধুর মাঝে, সেই পুরুষের এমন ভিবৎস, ক্ষুদার্ত নেকড়ের রুপ সে কোন ভাবেই মিলাতে পারেনি কয়েকরাত। তাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে, শুষে খেয়েছে, লেহন করেছে সাপের জিহ্বার মত, রক্তাক্ত করেছে, নিষ্পেশিত করেছে চিবুক এর নিচ থেকে ঊরুসন্ধি পর্যন্ত।
মাসিক এর দিনগুলো ছাড়া প্রতিরাতে সেজে গুজে যেতে হতো সেই সব লোকদের সামনে। তারা দিনের আলোয় বলে – নিষিদ্ধ পল্লী, রাতের অন্ধকারে সেই পল্লী আর নিষিদ্ধ থাকে না তাদের কাছে। তা হয়ে যায় সুধাপানের কাঙ্খিত স্থান। সেখানে রঙ মেখে রাতের পর রাত চলেছে সম্ভোগের নামে হিংস্র থাবার আচড়, টাকা দিয়ে কেনা সুখের সর্বোত্তম ব্যবহারের চেষ্টা। তাদের নিচে পড়ে থাকা সেই মেয়ে মানুষটি ও এক সময় সব আবেগ অনুভূতি শূণ্য হয়ে নিজেকে সঁপে দিত প্রতি রাতে।
ছাবিনা কোনদিন বুঝে নাই তার শরীরের কোন চাওয়া থাকতে পারে, মনের কোন চাওয়া থাকতে পারে। এই হিংস্র মানুষদের শরীরের তীব্র ক্ষুদায় নিজেকে খাদ্য হিসাবে বিলাতে হবে – সে যেভাবেই হোক, তাদের সব চাওয়া মিটাতে হবে – এটাই মেনে নিয়েছিল সে।
এই মেনে নেয়া জীবনে এরই মধ্যে একদিন এক যুবকের আগমন। তখন সাঁঝের লালচে আলো নিভে তারা ফুটেছে মাত্র, আকাশে পঞ্চমীর চাঁদ, যদিও সে আলো সেই বস্তিতে ঢুকে না, সেখানে একই সাথে বিজলীর আলো ও জীবনের অন্ধকার দুই ই পাশাপাশি থাকে জড়াজড়ি করে।
সেই আলো আধাঁরিতেই সবার মত খদ্দেরের আশায় সেজে-গুজে রাতের রোজগারের আশায় বসে ছিল ছাবিনা। খদ্দের না এলে টান পড়োবে জমানো টাকায়, কমবে জমানো টাকা। বেঁচে থাকতে হলে টাকার থেকে আর কিছুর কি বেশী প্রয়োজন ? এরই মধ্যে শিখে গেছে সে, এই টাকার বায়বীয় প্রয়োজনীয়তা।
মুখে সস্তা দামের পাউডার, ঠোটে লাল টকটকে ২ টাকার লিপিস্টিক আর চোখে কাজল লাগিয়ে বসে থাকা – কখনও কখনও পরনের শাড়ী টা খুলে দেহ দেখিয়ে সেই দেহলোভী মানুষ গুলোকে আকর্ষনের চেষ্টা – এরই মাঝে বয়ে চলা জীবন – ঠিক জীবন নয়, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময় টুকু পার করে দেয়া – কোন না কোন ভাবে, জীবন নামের সময় টুকু কে টেনে নিয়ে বেড়ানো – রাত টা কোন শরীরের নিচে রেখে পার করে দিয়ে সকালে আলো ফুটে বিশাল শুণ্যতা নিয়ে।
সেখানে ছাবিনার ঘরে সেদিন সেই যুবকের আগমন। দেহের ক্ষুদায় । তাছাড়া তো কেউ আর আসে না এখানে।
এই পাড়ার ঘরগুলোতে প্রতিরাতে একই নাটকের মঞ্চায়ন হয়। আবেগ আর অনুভূতি বিহীন পুরুষ শরীরগুলো শহরের রাস্তার মত বারে বারে খুড়ে বিধ্বস্ত করে নিষিদ্ধ পল্লীর সস্তা অনুভূতি হীন মেয়েদের। নিজের সুখটুকু নিয়ে ফিরে যায়, টাকা দেয়া কেনা যে সুখ টুকু, তা কি আর কাউকে দেয়া যায়!!! নিষিদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানুষগুলো প্রতিনিয়ত সহবাস করে কষ্ট, উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্যের সাথে, সঙ্গম করে বিবর্ণ জীবনের সাথে। ভুলেই যায় একসময়ে তারা যে মানুষ।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বস্তির আলোগুলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে এখানে আসা পুরুষগুলোরও জ্বলে উঠে পশুত্ব, “মাগী কাপড় খোল, দেরী করস ক্যান” – বলে হামলে পড়ে তারা শরীরের নেশায়। তেমন এক সন্ধ্যায় সেই যুবকটি প্রবেশ করলো ছাবিনার ঘরে। শ্যামলা বর্ণের যুবকটির সামনে নিজেকে মেলে ধরে ছাবিনা। প্রস্তুতি নেয় আরেকটি অন্ধকার রাতের। রাতের মত তার জীবন নাকি তার জীবনের মত রাত, সে ভাবার সময় নেই তার, শুধু জানে এই রাতটিকে পার করে দিতে হবে। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই ফিরে যাবে আগুন্তক, নিজেকে ধুয়ে মুছে চেস্টা করবে রাতের সেই কষ্টগুলো পরিষ্কার করার। আবার বেলা গড়াবে, অপেক্ষা নতুন লোকের কিংবা ফিরে যাওয়া সে ব্যাক্তিটির, শুরু হবে আরেক কষ্টের উপাখ্যান।
প্রতিদিনের মত ছাবিনা উদ্যত হয়, আগুন্তকের সামনে বসে তার ব্লাউজের বোতাম খুলতে... প্রতিরাতের অভ্যস্ত হাতে। খুলতে খুলতে চোখ বুজে ফেলে। লজ্জায় না, ঘৃনায়। পুরুষ মানুষের প্রতি একরাশ ঘৃনা নিয়ে চোখ বুজে সে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে যুবকটী হাত ধরে নামিয়ে দেয় ব্লাউজের উপর থেকে। শুরু হয় নাটকের পরের অঙ্কের দৃশ্যায়ন, কিন্তু সেদিন সে নাটকের পরের অঙ্কের জন্য প্রস্তুত ছিলনা ছাবিনা।
এখানে আসার পর থেকে শুধু শরীর বিকিয়েছে তারপরেও শরীরের ভিতর আরেকটা শরীর বাস করে , সেরাতে উপলব্ধি করলো ছাবিনা। সে রাত ছাবিনার কেটেছে প্রতিটা মুহুর্ত রোমাঞ্চিত হতে হতে, যুবকের প্রতিটা স্পর্শে আলোড়িত হয়ে, প্রতিটা চুম্বন যেন হেমন্তের নরম আলোর সোনালী বিকেলের মত ছুঁয়ে গেছে। আন্দোলিত করে গেছে প্রতিটি রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায়। শরীর কেঁপে উঠেছে বার বার। কখনো বর্ষনে সিক্ত হয়েছে কখনো বা ছাবিনাকে পুড়িয়েছে ভালোবাসার খরতাপে। আর জোয়ারের ঢেউ এর মত বারেবার আছড়ে পড়েছে যুবকের লোমশ বুকের বেলাভূমিতে। আলতো স্পর্শ কিংবা গভীর চুম্বন কিংবা চুম্বনের স্পর্শে ছাবিনা অনুভব করলো সেদিন তার নারীত্ব। শিশিরবিন্দুর মত জমে থাকা বিন্দু বিন্দু শ্বেতকনিকার মাঝে সস্তা পাউডার মাখানো মুখ ঘষে ভালোবাসা নিংড়ে বের করতে চেয়েছে যুবকের বুক থেকে। পরম মমতায় তাকে শীতের কুয়াশার মত পোড় খাওয়া হাত দুটি আলিঙ্গন করে রেখেছিল অচেনা সে যুবকটি। আর তার বিনিময়ে যুবকটি তাকে শীতের সকালের সূর্যের মত জড়িয়ে দিয়েছে উত্তাপ। সেখানে শারীরিক ভালোবাসার উর্ধ্বে রচিত হয়েছিল এক অপার্থিব ভালোবাসার মায়াবী শ্বেত জোৎসনার হাহাকার। ছাবিনা কে সম্ভোগ নয়, যেন সিগারেটের আগুনে পোড়া ঠোটের প্রতিটা গাঢ় চুম্বনে, তার ভিতর থেকে বের করে এনেছিল জমে থাকা কষ্টের বিষবাস্প।
রাত শেষে ভোর হয়, পুবের আলোতে চিকচিক করে উঠে পদ্মার পানি। একসময় ফিরে যায় যুবকটি নিয়মমত। জেগে উঠা চরে সূর্যের আলো এসে পড়ে, ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক গলে সে আলো ঢুকে সেই পদ্মাপাড়ের বস্তিতে। রাতের পাখিদের বিদায় দিয়ে নিষিদ্ধ বস্তির মেয়েগুলো গতানুগতিক জীবনের মত কলপাড়ে গিয়ে ধুয়ে ফেলে রাতের নোংরামি গুলো। চিৎকার আর খিস্তি খেউড়ে তে সরগরম হয় বস্তির পরিবেশ।
ছাবিনা তখনো তার ঘুণে ধরা চৌকি তে শুয়ে, ভালোবাসার আবেশ মাখানো, রাতের সে যুবকের শরীরের গন্ধে বিভোর হয়ে তন্দ্রাজালে আচ্ছন্ন। কে যেন এমন সময় বলে উঠলো বাইরে থেকে – “হুউম, মাগীদের আবার ভালোবাসা বলে কিছু আছে নাকি রে, ওই সব মানুষগো কাম, আমাগো না” !!!
তন্দ্রা ছেড়ে ছাবিনা বিছানা থেকে উঠে প্রস্তুতি নেয় আরেকটি দিনের।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন