বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


রবিবার, ২ মে, ২০১০

নাইট গার্ড

১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একখানি কামরা। উপরে টিনের চাল, একপাশে জানালা একটা আছে, তার কারনে ঘরের ভিতরে অন্ততঃ বেঁচে থাকা যায়, বাতাস ঢুকা তো অনেক দুরের ব্যপার। ঘরের ভিতরে প্রচন্ড গরমে হাঁশফাশ করতে করতে শুয়ে ছিলাম ঘামে ভিজে। মশার কয়েলের ধোঁয়ার ভিতরেও দুএকটা মশা কানের কাছে এসে জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তাদের সরব উপস্থিতি। এই অবস্থায় টিকতে না পেরে ঘরের বাইরে এসে বসি। এই বাসার একটা সুবিধা এবং অসুবিধা হল মেইন গেইট কখনই তালা দেয়া হয় না, ঘর ভরা ভাড়াটিয়া , তারা আসে আর যায় দিনরাত ২৪ ঘন্টা।

ঘরের বাইরে বেশ ঠান্ডা। আকাশ ভরা তারাদের মেলা। একটু একটু বাতাস বইছে মাঝে মাঝে, শরীর টা জুড়িয়ে দিতে। বাড়ির সামনে ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, দুইদিন আগের বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি গুলো এখন কাঁদা হয়ে থক থক করছে। সেই কর্দমাক্ত রাস্তার ধারেই একটা টুল নিয়ে বসলাম আমি। সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর একটু ঠান্ডা বাতাস আসছে যেন কোন দিক দিয়ে।

বিদ্যূতের খুটি গুলোতে লাইটের পয়েন্ট থাকলেও আমি এখানে আসার পর কোন লাইট জ্বলতে দেখিনি। অবশ্য খারাপ লাগছে না সেই অন্ধকার, চাঁদের আলো উপভোগ করা যায়, তারাদের আলো তে সাঁজানো আকাশ দেখা যায়। যদিও সেই অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে অনেকেই হাত পা ভেঙ্গেছেন, ছিনতাই কারীর কবলে পড়েছেন অনেক কিংবা শ্লীলতা হানীর মত অনেক কিছুই ঘটেছে এই অন্ধকার কে ঘিরে। আমার এগুলো তে বিকার নেই কারন আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না এই অন্ধকারের কারনে, বরং আমি উপভোগ করছি এই অন্ধকার। আমার সমস্যা না হলে তো আমার মাথা ব্যাথার দরকার নাই, দুনিয়াটাই এখন এরকম।

কতক্ষন বসে ছিলাম জানিনা , একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম, একটা ফ্যাসফ্যসে গলার শব্দে তন্দ্রা ছুটে যায়। সামনে দেখি বয়স্ক একজন ব্যক্তি , হাতে লাঠি, মুখ ভরা দাড়ি, চোখে চশমা নিয়ে আমার দিকে ঝুকে আছে। কিছুটা অপ্রস্তুত হই উনাকে দেখে। যদিও বাইরে অন্ধকার তবুও বাসার ভিতর থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা আলোয় তাঁকে আবছা আবছা দেখতে পেলাম।

"এইখানে ঘুমান কেন বাবাজী ??" - আমার দিকে ঝুকে এসে প্রশ্ন টা করলেন সেই বয়স্ক লোক টি। একটা অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি কোন উত্তর না দিয়ে। সত্যিই তো , প্রায় ঘুমায়ে পড়েছিলাম রাস্তার পাশে, সকালে অফিস যেতে হবে খেয়ালই ছিলনা।

ঘরে গিয়ে আবার সেই গরমের মধ্যে, মশার কয়েলের ধোঁয়ার মধ্যে শুয়ে পড়ি । তেল চিটচিটে বালিশে মাথা রাখতেই চোখ দুটো ভারি হয়ে পড়ে। পুরো ঘর জুড়ে ঘামের একটা বোঁটকা গন্ধ জমে আছে, পরনের শার্ট কিংবা বিছানার চাদর থেকে আসা সে বোঁটকা গন্ধে অভ্যস্ত আমি ঘুমিয়ে পড়ি একসময়।

চাকুরী আর চাকর গিরির মধ্যে পার্থক্য খোঁজার চেষ্টা করি মাঝে মাঝে। বিশেষ করে আমাদের কারখানার মালিক যেভাবে গালিগালাজ করেন আমাদের, নিজেকে চাকর ছাড়া আর অন্য কিছুই মনে হয় না। এই চাকরগিরি করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত।

প্রতিদিনের মত আজ বাসায় ফিরছি। ফেরার পথে দেখি আমাদের মহল্লার সামনে বিশাল জটলা। একদল মানুষ একসঙ্গে কথা বলছে সেই জটলা। কৌতূহল সামলাতে না পেরে আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম জটলায়। দেখি একপাশে সমাজের সমাজপতি রা বসে আছেন ডেকোরেটর থেকে আনা চেয়ারে। তাদের সামনে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছেন এক বয়স্ক লোক। ভালো করে খেয়াল করে দেখে বুঝলাম যে আর কেউ না, কালকে রাতে আমার তন্দ্রা ভাঙ্গিয়ে দেয়া সেই মানুষটি। তার বিচার হবে এখন।

তাকে নাইটগার্ড এর চাকরী দেয়া হয়েছিল নাকি মাস তিনেক আগে। কিন্তু সে যে ডিউটি করতো, মহল্লার লোকজন তা জানতেই পারেনি। এই তিন মাসে চুরি ও নাকি অনেক বেড়ে গেছে, টেলিফোনের তার প্রতিরাতেই চুরি হচ্ছে। একজন নাইট গার্ড থাকতে কেন চুরি হচ্ছে , সেটা নিয়েই আজকের সালিশ।

অপরের কষ্ট দেখলে আমরা কেন জানি আহ্লাদিত হই, আজ ও তাই নাইট গার্ডের কষ্ট দেখে নিজেরে বেশ সূখী মানুষ মনে হচ্ছিল। মনে হয় আমার একার না, উপস্থিত সবারই এরকম মনে হচ্ছিল, তাই সবাই উচ্ছাস নিয়ে, নানা মন্তব্য করে সেই সালিশ টা উপভোগ করছিল।

দাঁড়িয়ে আছে নাইট গার্ড টি। চোখে মোটা কাঁচের কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে একটা কালো ছাতি, পরনে ময়লা পানজাবি আর লুঙ্গি। ফ্যসফ্যসে গলায় লোকটা আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন মনে হল। স্পষ্ট ভাবে কোন কথা কানে আসছিল না আশে পাশে হট্টগোলের কারনে। এক সময় এক সমাজপতি ধমকের সুরে সবাইকে থামতে বললে ঠান্ডা হয় হট্টগোল।

নাইট গার্ড এর জবান থেকে যা জানলাম , তার হাঁপানীর সমস্যার কারনে বাঁশী ফু দিতে পারে না জোরে, কথাও বলতে পারে না জোরে, কানে খুবই কম শুনে, চোখেও কম দেখে আবার ছানি পড়েছে ২ চোখেই। আর এই সব জেনেশুনেই এখানেরই এক সমাজপতি, কিছু টাকা ঘুষ খেয়ে তাকে চাকরী টা দিয়েছে।

সেখানে উপস্থিত সবাই দম আটকিয়ে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধ লোকটির দিকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন