বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


রবিবার, ২ মে, ২০১০

ফেরা

কেবিন নং - ৪০৭। সাদার শুভ্রতায় মোড়া ভি আই পি কেবিনের দেয়াল থেকে শুরু করে সব কিছুর মধ্যে একটা চাপা বড়লোকি গন্ধ। ভিতরে এসি চলছে নিঃশব্দে। এক পাশের বিছানায় সাদা চাদরে মুড়ে শুয়ে আছে রবিন। আরেক পাশের বিছানায় ঝিমুচ্ছিল রবিনের ছোট বোন। দরজায় টোকা পড়োতেই ঝিমুনি বাদ দিয়ে দরজা খুলে দেয়।

কেবিনের ভিতর ঢুকেই একবার মাথা ঘুরিয়ে পুরো কেবিনটা দেখে নেয় রুমু। একটা অস্বস্তিকর গুমোট এলিট পরিবেশ কেবিনে। তারপর পা টিপে গিয়ে বসে রবিনের বিছানার পাশে রাখা চেয়ার টায়। সাদা চাদরে দিয়ে আবৃত রবিনের পুরো শরীরের মধ্যে শুধু মুখ টুকুই বের হয়ে আছে। কপালে ব্যান্ডেজ, চোয়ালে ব্যন্ডেজ। মাথায় ব্যন্ডেজ, চুল সব ফেলে দিয়ে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঘিরে রেখেছে পুরো মাথা। যা বের হয়ে আছে তা দেখে ও তাকে চেনার উপায় নাই।

রবিনের দিকে তাকাতেই হু হু করে কান্না বের হয়ে আসতে চায় রুমুর। অনেক কষ্টে নিজেকে ঠেকায় ছল ছল চোখে। কিছু ক্ষন পর পর আঁচল দিয়ে মুছে কয়েকদিনের না ঘুমানো , নিচে কালো কালি পড়া চোখ দুটো। দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়া চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই রুমু সদ্য যুবতি এক মেয়ে। যেন কয়েকদিনেই বুড়িয়ে গেছে গেছে সে একবারে।

একবার ভাবে হাতটা ধরবে রবিনের। আবার কি মনে করে বাদ দেয় । আচঁল টেনে আবার ঠিক হয়ে বসে রুমু।

অনেক দিন পরে রুমু দেখলো রবিন কে। কিন্তু এই অবস্থায় তো দেখতে চায়নি সে। রবিনের এক্সিডেন্টের খবর পেয়েই আসতে চেয়েছিল কিন্তু তার কোলের মেয়েটার তখন প্রচন্ড জ্বর। তাকে একলা ঘরে ফেলে আর আসতে পারেনি সে। জ্বর কমলে তাকে মা'র বাসায় রেখে তারপর রুমু এসেছে এখানে।

রবিনের দিকে তাকিয়ে রুমু মনে করার চেষ্টা করছিল তার সুখের দিন গুলোর কথা। তাদের বিয়ে হয়েছে বছর সাতেক হবে। পরষ্পর কে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল তারা। তখন রবিনের সামান্য চাকরী, সীমিত আয় - সেখানে স্বাচ্ছল্য না থাকলেও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, ছিল হৃদয়ের টান, ভালবাসার বোঝাপড়া।

এক সময় সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য আনতে গিয়ে রবিন চাকরী ছেড়ে ব্যবসা ধরে এক বন্ধুর সাথে - পার্টনারশীপে। কয়েকবছরেই তাদের পূঁজি বাড়তে থাকে , বাড়তে থাকে লাভের পরিমান। বড় হয় ব্যবসা, একসময়ে সারা বাংলাদেশে তারা একাই একচেটিয়া ব্যবসা করে শুরু করে।

আর তখন রাতারাতি মধ্যবিত্ত সাইনবোর্ড নামিয়ে উচ্চবিত্ত সাইনবোর্ড লাগানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে রবিন। ধানমন্ডিতে একটা ফ্ল্যাট কিনে সে, সাথে টয়োটা এফ প্রিমিও গাড়ী ও কিনে তার পর পর। বদলে ফেলে বাসার পুরোন অথচ ভালোবাসায় ভরা ফার্নিচার গুলো। জানাল্য উঠে ভারি দামি পর্দার ২ স্তর।

তবুও তার ভালোবাসার কমতি ছিল না রবিন কিংবা রুমুর। সকাল বিকাল কাজের ফাঁকে রুমুর খোঁজ নেয়া , রুমুর জন্য অফিস থেকে এটা সেটা গিফট পাঠিয়ে দেয়া, কিংবা হঠাৎ করে বাইরে কোন বুফে তে খাওয়া এভাবেই তাদের চলছিল।

সেই লোকটার হঠাৎ করেই কি যেন হয়ে গেল। দিনের পর দিন বাসার বাইরে রাত কাটাতে লাগলো । ফোন করলে ফোন ধরে না কিংবা কেটে দেয়। এদিকে রুমুর গর্ভে তখন তাদের ভালোবাসার ফুল ফুটতে শুরু করেছে। রুমু সুখবরটা ও সবার প্রথমে দিতে পারেনি রবিন কে তখন।

রুমু যখন হন্যে হয়ে রবিন কে খুঁজছিল, তখন একদিন খবর পায় রবিন আরেকটা বিয়ে করে সেখানে সংসার পেতেছে। রবিনদের বাসায় গিয়েও কোন সাহায্য পায়না রুমু, এমনকি তার বাসার লোকেরাও জানেও নাতার বিয়ের খবর।

স্বাভাবিক ভাবেই রবিন ব্যস্ত থাকে তার নতুন সংসার নিয়ে। রুমুর দিন কাটতে থাকে কষ্টে। এক সময় বড় ফ্ল্যাট ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে উঠে রুমু। ফ্ল্যাট টা ভাড়া দিয়ে যা পায় তা দিয়েই সংসার চলে তার। তার বাবা মা কত করে বলেছে তাদের সাথে গিয়ে থাকতে কিন্তু রুমু থাকেনি, আত্মসম্মানে লাগে তার। এক রকম জিদ করেই সে রবিন কে বিয়ে করেছিল সে তখন।

রবিন ব্যবসার কাজে ঢাকার বাইরে গেছিল, সেখান থেকে ফেরার পথে উলটা দিক থেকে একটা ট্রাক এসে রবিনের গাড়ির উপর দিয়ে চলে যায়। মৃত্যু কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে চলে যায়। রেখে যায় তার চিহ্ন। মাথা, মুখে প্রচন্ড আঘাত লেগে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রবিন।

সেখান থেকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলে তারপর সেখান থেকে এপোলো হাসপাতালে। মাথায় অপারেশন হয়েছে, চোয়ালের, কপালের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল , সেগুলো মেরামত করে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়েছে।

এক্সিডেন্টের পর একবারই হুশ এসেছিল রবিনের। কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে কয়েকদিন ধরে। আজ আবার একটু একটু করে হুশ ফিরে আসছে।

চোখ খোলার চেষ্টা করছিল রবিন অনেক ক্ষন ধরে। চোখের পাতা নাড়াতেই যেন তার পুরো শরীরের শক্তি খরচ করতে হচ্ছিল। কোন রকম চোখ টা মেলে সে। দেখে সামনে বসে আছে কলেজ পড়া অদ্ভুত সুন্দর একটা মেয়ে। কোথায় যেন সেন দেখেছে সে।

দুপাশে বেনী করা, কলেজ ড্রেস পড়া মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করে চেয়ে আছে তার দিকে, অথচ তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। নিষ্পাপ চেহারায় একটা ভালোলাগার দ্যুতি ছড়ানো। মেয়েটিকে কোথায় যেন দেখেছে সে, কোথায় যেন দেখেছে !!!! এত চেনা চেনা চেহারা !!!!! এতবার দেখেছে , অথচ মনে করতে পারছেনা !!!

রবিন আস্তে আস্তে হাতটা বাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে মেয়েটির দিকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন