গৌরাঙ্গ বাবু তাহার দখিন দিকের ঘরের বারান্দায়, আরাম কেদারাখানি তে বসিয়া শীতের সকালের মিষ্টি রোদ এ গা ঝালাই করিয়া লইতেছেন । রাত্রির অনাবশ্যক হীম পড়িবার পর সকালে এই রৌদ্রচ্ছটা তে বসিয়া পা উঁচাইয়া একটি টুলের উপরে রাখিয়া , লুঙ্গি খানি হাটুর উপরে তুলিয়া তাহার মেদবহুল শরীর খানি বাহির করিয়া রৌদ্রে নসিকা কুঞ্চন করিয়া ভুরু কুচকাইয়া চক্ষু মুদিয়া বসিয়া আছেন।
ঘরের পিছনে বৃক্ষরাজির ফাঁক হইতে সূর্যালোক আসিয়া পড়িতেছে বারান্দা খানিতে, সম্মুখে বিশাল আঙিনা। প্রতিদিন গোবরে লেপিয়া রাখাতে উহার উপরে শক্ত আস্তর পড়িয়াছে, সকালে উঠিয়া পেচির মা ঝাড়ু দিয়া তাহা ঝক ঝকে তক তকে করিয়া রাখিয়াছে প্রতিদিনের মত। আঙিনার অপর প্রান্তে রন্ধনশালা। গৌরাঙ্গ বাবুর সহধর্মিনী শশব্যস্ত হইয়া খাবার প্রস্তুত করিতেছেন সেথায়, আর তাহা হইতে নানা মুখরোচক খাবারের ঘ্রান উড়িয়া আসিতেছিল পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়া।
আর তাহার গৌর বাহু তে ফটিক আপন মনে তৈল মালিশ করিয়া যাইতেছে। দক্ষিন দিকের বাহু তে তৈল মালিশ করা শেষ হইলে ফটিক তাহার পদ যুগল মালিশ করিতে উদ্যত হইবে, এমন সময় রন্ধনশালা হইতে গৌরাঙ্গ বাবুর সহধর্মিনীর গলা শুনিয়া ফটিক ঘুরিয়া তাকায়, গৌরাঙ্গ বাবু চক্ষু খুলিয়া বিষয় খানা ঠাহর করিবার চেষ্টা করেন।
হুস , হুশ , যা যা, বাইরে যা...।।যা যা ভাগ ভাগ এইখানে কি " ইত্যাদি শব্দ আসিতে লাগিল রন্ধনশালা হইতে। গৌরাঙ্গ বাবু চক্ষু খুলিয়া ফটিকের দিকে একবার চাহিল, তাহাতেই ফটিক বুঝিয়া গেল যে তাহাকে যাইতে নির্দেশ করিতেছেন , বিষয় খানা কি বুঝিবার জন্য।
ফটিক, বয়স ১৫ কি ১৬ হইবে, নাসিকা রন্ধ্রের নিচে কৃষ্ণ বর্ণ ধারন করিয়াছে মাত্র। তাহার একখানি নাম ছিল কিন্তু তাহা ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে এই ফটিক নামের আড়ালে। তাহার ছট-ফটানি, দুরন্তপনা , পাখি, বৃক্ষদের সাথে ভাব দেখিয়া একদা এক বাবু তাহাকে ফটিক বলিয়া ডাকিয়াছিলেন, তাহার পর হইতেই তাহাকে সকলেই ফটিক বলিয়াই সম্বোধন করে। তাহার জোড়া ভুরু, মায়াবী চক্ষু জোড়ায় রাজ্যের বিস্ময় ভর করিয়া থাকে। যাহা দেখে তাহাই তাহার ভাল লাগে, যাহা সামনে পাইবে তাহাই সে শিখিতে চাইবে, এইরুপ ভাবেই সে শৈশব কাটাইয়া কৈশরে পদার্পন করিয়াছে মাত্র।
শৈশবে তাহার পিতা যক্ষা রোগে পরপারে চলিয়া গিয়াছে, আর তাহার বছর খানেক পর তাহার মাতা ও কালাজ্বরে ভুগিয়া ইহলীলা সাঙ্গ করিয়াছে। তাহার পর হইতে সে গৌরাঙ্গ বাবুর বাড়ীতে আশ্রিত। এখানে সে ফুট ফরমায়েশ খাটে, রাখাল দের সহিত মাঠে যাইয়া কাজ করে, গৌরাঙ্গ বাবুর চশমা টা, জুতা জোড়া আগাইয়া দেয়া, শরীর বানাইয়া দেয়া সহ নানাবিধ কাজ করিতে হয় তাহাকে দিনমান। তাহার জগৎ বলিতে এই অজপাড়াগাঁ খানি। ইহার বাইরে সে হাটে গিয়াছে মাত্র। তাহার জগৎ খানি সে আপন মনে সাজাইয়া লইয়াছে। তাহাতে সে নিজেই প্রজা নিজেই রাজা। কাজের ফাঁকে বাড়ীর পিছনের বাগানে যাইয়া সে আপন মনে পাখিদের সহিত কথা বলে, বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকাইয়া একা একা খেলে। লতা গুল্ম গলায় পড়িয়া, গায়ে জড়াইয়া বৃক্ষমানুষ সাজিবার চেষ্টা করে। গৌরাঙ্গ বাবুর চাষের জমির পাশের নদীতে যাইয়া ডুবিয়া থাকিবে , পা ডুবাইয়া বসিয়া থাকিবে ঘন্টার পর ঘন্টা। সন্ধ্যা হইলে আবার ঘরে ফিরিয়া চাপকল হইতে পানি তুলিয়া গৃহস্থালির জন্য রাখিয়া হাত মুখ ধুইয়া মাদুর পাতিয়া অপেক্ষা করে রাত্রির খাবারের লাগিয়া। জোনাকীর মিট মিটি আলোতে তাহার অপেক্ষার প্রহত গুনিতে থাকে। কদাচিৎ ঘুমাইয়া পড়িলে সেই রাত্রিতে অভুক্ত থাকিয়া যায় সে।
ফটিক উঠানে পা রাখা মাত্রই দেখিতে পায় একখানা সারমেয় রন্ধন শালা হইতে বাহির হইতেছে। এতক্ষনে সে বুঝিল গিন্নি মাতার চিৎকার এর কারন কি। তাহাদের পালিত সারমেয় নয় বটে কিন্তু এই পাড়ায় উহা এ বাড়ীতে সে বাড়ীতে অবাধে চলাফেরা করিতে পারে। কি মনে করিয়া আজ সে গৌরাঙ্গ বাবুর রন্ধনশালায় ঢুকিয়া পড়িয়াছিল।
ফটিক আবার ফিরিয়া আসিয়া গৌরাঙ্গ বাবুর শরীর - সেবায় মনোনিবেশ করে। গৌরাঙ্গ বাবু স্নান করিতে যাবার আগ পর্যন্ত সে তৈল মর্দন করিয়া, দলাইয়া তাহার শরীর খানি হালকা পেখমের ন্যায় করিয়া দেয়।
ফটিক দুপুরে রাখালদের জন্য আহার আনিয়া সেখানেই রহিয়া গিয়াছিল। দুপুর বেলা একদল বেঁদে নৌকায় করিয়া তাহাদের জমির নিকট আসিয়া খূটি গাড়িয়া , তাহাদের নৌকা আর ঝোলা হইতে নানা প্রকারের ভূজঙ্গ বাহির করিয়া কি কি যেন করিতে লাগিল। ফটিক মুগ্ধ হইয়া তাহা দেখিতে গিয়া তাহার নিজের আহার গ্রহনের কথা আর স্মরনে রইলো না। পরে বেঁদের দল গ্রামের দিকে রওনা দিলে ফটিক চাহিয়া দেখে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলিয়া পড়িয়াছে, তাহা রক্তিম বর্ণ ধারন করিয়াছে। উত্তর দিক হইতে ঠান্ডা বাতাস বহিতে শুরু করিয়াছে। এতক্ষনে ফটিকের খেয়াল হইল যে সে দুপূরে আহার করে নাই। তাহার ভিতরের ক্ষুদা যেন তাহাকেই গ্রাস করিয়া ফেলিবে , এমন অবস্থা। সে কোন রকম বাড়ীর দিকে পা বাড়াইলো।
ফটিক ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইল তাহার গিন্নি মা রন্ধন শালায় কাজ করিতেছেন , রাত্রির রান্না প্রস্তুত করিতেছেন মনে হয়। ফটিক সাত-পাঁচ না ভাবিয়া ক্ষুদা নিবারনের জন্য রন্ধনশালার দিকে পা বাড়াইলো।
ভিতরে গিন্নি মা রাঁধিতেছিলেন, তাহার পাশে বসা পেচির মা, হঠাৎ ফটিক কে রন্ধনশালার দরজায় দেখিয়া গিন্নি মা চিৎকার করিয়া উঠিল – “এইখানে কি , যা যা ভাগ ভাগ”
ফটিক আর পা বাড়াইলো না, ফিরিয়া আসিল রন্ধনশালা হইতে। এই কথা গুলিই সে আজই সকালে শুনিতে পাইয়াছিল ।
নিজেকে তাহা হইতে কিছু উন্নত মনে হইল না তাহার।
বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি
আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।
মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।
লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন