ঝিঝি পোঁকার বিরামহীন ডেকে চলা , মাঝে মাঝে তা ছাঁপিয়ে সুপারির পাতায় হুমড়ী খেয়ে পড়া বাতাসের সাথে সুপারির পাতার ধস্তাধস্তির শব্দ। সেই বাতাসের কিছু অংশ মাঝে মাঝে পথ ভুলে ঢুকে পড়ছে জানালার ভিতরে, বের হবার পথ না পেয়ে আবার ফিরে যায় অজানায়।
আকাশে তখন মাঝ রাত্রিরের ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের ভগ্নাংশ। ম্লান জোছনার আলো এসে পড়েছে সুপারি গাছের পাতায়, খানিকটা ভাঙ্গা জানালা গলে ভিতরে ঢুকেছে লজ্জিত ভঙ্গিতে। কপাটা হীন , ভাঙ্গা শিকের জানালা দিয়ে তাকাতেই সেই আলোর খানিকটা দেখা যায়। ঘরের এক কোনে একটাই জানালা। জানালার শিক গুলো মরচে ধরে নড়বড়ে হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় কাঠ ভেঙ্গে ভিতরের একদা অদৃশ্য অংশ এখন লজ্জা শরমহীন হয়ে বেরিয়ে আছে ছেঁড়া শাড়ী দিয়ে নিজেকে ঢাকার চেষ্টায় ব্যস্ত পাশের বস্তির রহিমার মা'র শরীরের মত।
সেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে এক জোড়া চোখ। বাইরের জোনাক পোঁকার বারবার আলোর নিভে যাওয়ার মত বার বার চোখের পলক পড়ছে তার। হঠাৎ খস খস শব্দে চমকে উঠে । কোন বাদুড় হয়তো ডানা ঝাপটিয়ে পাশের তাল গাছটিতে আঁকড়ে ধরতে চাইছে।
ঘুমহীন প্রতি রাতের মত এই রাতও কাটছে তাঁর একই ভাবে। সেই চিরচেনা জানালা, জানালার বাইরে চিরচেনা সেই বাগান, নারকেন, সুপারি আর নানান গাছের সেই বাগান - কতদিনের চেনা। বাগানের পাতার ফাঁক গলে ভূমি স্পর্শ করা চাঁদের আলোর আর ছায়ার জড়াজড়ি বাগান জুড়ে। কিংবা আমাবস্যার রাত্রিতে ঘুট ঘুটে অন্ধকারের উল্লাসধ্বনি - সবই চিরচেনা ।
শুধু নিজেকেই চিনতে পারলো না সে আজও। নিজেকে না চেনার সেই কষ্ট প্রতি রাতে তাঁকে ছুরি চালায় তার চিন্তায়, কল্পনায়, তাঁর ভিতর জমে থাকা বিশ্বাসে।
হু হু করে কেঁদে উঠে সে। নিরব, অন্ধকার কক্ষ জুড়ে তখন তাঁর কান্নার ধ্বনি ছন্দ তুলে নেচে চলে ভুলে ঢুকে যাওয়া বাতাসের সাথে, জানালা গলে আসা এক চিলতে চাঁদের আলো থামিয়ে দিতে চায় সে গোঙানীর শব্দকে।
কক্ষের ভিতরের অন্ধকার এসে আলতো করে তাঁকে জড়িয়ে ধরে, নিয়ে যেতে চায় আরো অন্ধকারের মাঝে, আরো অন্ধকারে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন