বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হইয়াছে। বিচারকের আসনে বসিয়া ঈশ্বর একে একে সকলের
নথি উল্টাইয়া দেখিতেছেন। তাহার চতুর্পাশ্বে সকল দেবদূত গণ ঘিরিয়া এ কার্য
সমাধা করিতে সাহায্য করিতেছে। এক এক করিয়া মানব সন্তানের ডাক আসিতেছে ,
মর্ত্যে তাহাদের কার্য-কলাপের নথি ঘাটিয়া , দেবদূতের সাক্ষ্য মানিয়া তাহাকে
নরকবাস না হয় স্বর্গ তে পাঠানো হইতেছে। তাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন
সুযোগ দেয়া হইতেছে না। ঈশ্বরের হুকুম সর্বদা আইন।
এরুপ চলিতে চলিতে এক সময় ডাক পড়িলো রবি ঠাকুরের। তাহার হিসাবের খাতা খুলিয়া ঈশ্বর অনেক ক্ষন ধরিয়া উলটাইয়া পাল্টাইয়া দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে ঈশ্বর ভ্রূ যুগল কুচকাইলেন। তাহার পর চক্ষু তুলিয়া তাকাইলেন রবি ঠাকুরের দিকে। তারপর বলিলেন "বটে রে ব্যাটা। পৃথিবীতে তো তুমি বেশ ঝামেলাই পাকায়েই এসেছো। তোমাকে তো নরকে যেতেই হবে। নো কম্প্রোমাইজ। নরক ঘুরে আসো তারপর তোমাকে স্বর্গে পাঠানো হইবে"
বলিয়া ঈশ্বর সেই হিসাবের খাতা বন্ধ করিতেই এক দেবদূত কহিলেন - নেক্সট
রবি ঠাকুর কিছু বলিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু তাহার আগেই কয়েকজন দেবদূত তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল চলিল নরকে পাঠাইবে বলিয়া। ঈশ্বরের হুকুম সর্বত্র আইন। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নহে।
এক অন্ধকার কক্ষে রবি ঠাকুর কে লইয়া যাওয়া হইলো। এক দেবদূত ইশারা করিতেই কক্ষের বাতি জ্বলিয়া উঠিল। রবি ঠাকুর দেখিলেন কক্ষের ঠিক মাঝখানে একখানা কাঠাল কাঠের চৌকি। তাহাতে তাহাকে ইশারায় শুইয়া পড়িতে বলিলো আরেক দেবদূত। কোন কথা না বাড়াইয়া সেখানে সোজা হইয়া শুইয়া পড়িলেন তিনি।
শুইবা মাত্রই অচেতন ঘুমে তলাইয়া গেলেন রবি ঠাকুর।
রচন্ড গরমে ঘুম ভাঙ্গিয়া যায় রবি ঠাকুর এর। ঘুম ভাঙ্গিয়া বুঝিতে পারেন শরীরের সাথে তাহার আলখাল্লা শ্বেতকনিকায় ভিজিয়া মাখামাখি হইয়া রহিয়াছে। তন্দ্রা মাখানো আঁখি পল্লব মেলিয়া দেখিলেন তিনি একখানা ছোট কামরার ভিতরে পাতা একখানা মলিন চৌকির উপর শুইয়া রহিয়াছেন। কামরা জুড়িয়া শুধু এই চৌকিখানা। এক কোনে একখানা তিন পায়া টেবিল কোনমতে দাঁড়া করাইয়া রাখা। কামরা খানার এক পার্শ্বের দেয়ালে ছোট একখানা জানালাও রহিয়াছে কিন্তু তাহার কপাট ভিতর স্থায়ীভাবেই আটকাইয়া দেয়া হইয়াছে। উপরে টিনের চাল।
আধাপাকা কক্ষটির এক পাশে ভাঙ্গা দরজা। দরজার ভিতর শতখানেক ছিদ্র দিয়া ওপাশ হইতে তীক্ষ্ণ আলো প্রবেশ করিয়া কক্ষের ভিতর এক আলো আঁধারি পরিবেশ রচনা করিয়াছে। এসব দেখিতে দেখিতে রবি ঠাকুরের হঠাৎ খেয়াল হইলো তাঁহাকে তো নরকে পাঠানো হইয়াছে। "তো ইহাই সেই নরক" - একা একা বিড় বিড় করিয়া বলিলেন।
চৌকি হইতে রবি উঠিয়া বসিলেন। প্রচুর জল তেষ্টা পাইয়াছে তাহার। কিন্তু আশে পাশে কোন কলস বা পানির পাত্র দেখিলেন না। নিজের স্ত্রীর নাম ধরিয়া ডাকিতে গিয়াও থামিয়া গেলেন তিনি। ইহা তো নরক, তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য স্ত্রী বা কোন দাস দাসি থাকিবার কথা না। অভ্যাসবশতঃ চৌকির নিচে খড়ম খুজিতে গেলেন। দেখিলেন একখানা প্লাস্টিকের চপ্পল রহিয়াছে সেখানে। অগিত্যা সেটিই পায়ে গলিয়ে চৌকি হইতে নামিয়া দাড়াইলেন।
সেই ছিদ্র ওয়ালা দরজার কপাট খুলিলেন। বাহিরে এপাশ ওপাশ তাকাইলেন। দেখিলেন তাঁহার কক্ষের ন্যায় সারি সারি কক্ষ , সারি সারি দরজা রহিয়াছে সেখানে। খুব মনযোগ দিয়া খুটাইয়া খুটাইয়া রবি, নরকের কক্ষ গুলি দেখিতে লাগিলেন। আশে পাশে মাঝে মধ্যে কদাচিৎ লোক জন দ্রুত বেগে পার হইয়া যাইতেছে। কেউ হয়তো এক ঝলক তাকাইয়া দেখিয়া লইতেছে, কেউ খেয়াল করিতেছে না।
হাঁটিতে হাঁটিতে রবি সেই সারিবদ্ধ ঘর গুলোর একদম এক কোনায় চলিয়া আসিলেন। সেথায় সেই শেষ অংশে বিশাল লোকের জটলা। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে তারঃস্বরে চিৎকার করিতেছে, হাতে কলস , বালতি লইয়া ঠেলা ঠেলি করিতেছে। এসব দেখিয়া রবি কৌতূহল নিয়া একটু উঁকি দিয়া তাকাইতেই দেখিলেন একখানা সরু নল হইতে জল আসিতেছে আর সেই নলের নিচে কে কখন বালতি, কলস দিবে তা নিয়া যুদ্ধ চলিতেছে। জল দেখিয়াই তেষ্টা আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠিলো। এক ব্যাক্তি, উদোম গা , লুঙ্গি ভাঁজ করে বাঁধা, বালতি ভরিয়া জল লইয়া যাইতেছিল। তাহাকে ডাকিয়া রবি ঠাকুর কহিল - "একটু জল দিবে বাপু ? "
- জল ? ঐ মিয়া পানিরে জল কন ক্যালা ? ডিশ দেইখা বুইড়া কালে ভিমরতি ধরছে ? বলিয়া খ্যাক খ্যাক করিতে করিতে বালতি লইয়া চলিয়া গেল। রবি বাবু তাহার পথের দিকে চাহিয়া রহিলেন কিছু ক্ষন।
কোন রকম জলতেষ্টা নিবারন করিয়া রবি বের হইলেন নরক দর্শনে। আস্তে আস্তে হাঁটিতে হাঁটিতে প্রধান ফটক পার হইলেন।
ফটক পার হইতেই চতুর্দিকে প্রচন্ড শব্দ , গাড়ীর হর্ন বাজিতেছে, মাইকে করিয়া কে যেন ''খাউজানির মলম" বিক্রির বিজ্ঞাপন করিতেছে। রবি ঠাকুর খানিকটা ভয় পাইয়া গেলেন এসব দেখিয়া। একটু আগাইতেই নাকে কটু দূর্গন্ধ আসিয়া ধাক্কা দিল। ডান দিকে তাকাইয়া দেখিলেন ময়লার স্তুপ। ভাবিলেন, স্বর্গ হইতে এসব ময়লা আনিয়া নরকে স্তুপ করা হয়।
নরকে এত মানুষ , এত গাড়ী, এমন কি রিকশাও দেখিয়া বড়ই অবাক হইলেন রবি। সেথায় পাকা রাস্তা, দোকানপাট, ঘরবাড়ি পর্যন্ত রহিয়াছে। এসব ভাবিতে ভাবিতে হাটিতেছেন , হঠাৎ করিয়াই দোকান গুলোর সাইনবোর্ড দেখিয়া থমকাইয়া গেলেন। এখানেও বাংলা !!! দেখিয়াই বড় আহ্লাদিত হইলেন তিনি। এখানেও বাংলা প্রচলিত !!! তাঁহার নোবেল পুরষ্কারের কল্যাণে বাংলা এখন নরক পর্যন্ত পৌছাইয়াছে। দেখিলেন এক দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা রহিয়াছে " জামাই বউ পাদুকা বিতান - চানখার পুল, ঢাকা" দেখিয়া কৌতুক অনুভব করিলেন তিনি।
তাঁহার কোন উদ্দেশ্য নাই, কোন তাড়া নাই। যেদিন মন চাহিতেছে , সেদিকেই হাঁটিতেছেন রবি। নরকের মানুষদের কার্যকলাপ দেখিয়া বড়ই আনন্দ অনুভব করিতেছেন। যাহার মন চাহিতেছে বড় রাস্তার পাশে বসিয়া মুত্র ত্যাগ করিতেছে, যেখানে খুশী সেখানে আবর্জনা ফেলিতেছে। উচ্চঃস্বরে মাইক বাজিতেছে। হাঁটিতে হাঁটিতে হঠাৎ করিয়া এক খানা গান তাঁহার কানে আসিলো। গান শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলেন। এ দেখি বাংলা ভাষায় গান বাজিতেছে !!!
গানটা তাঁহার বুকের ভিতর বাঁধিয়া গেল। গুন গুন করিয়া গাহিতে গাহিতে হাঁটিতে লাগিলেন। গুন গুন করিয়া রবি গাহিতে লাগিলো "বন্ধুর দুইটা চোখ , যেন দুই নলা বন্দুক, গুল্লি মাইরা ভাঙ্গো আমার মনেরও সিন্দুক"।
কতক্ষন হাটিলেন ঠিক ঠাওর করিতে পারিলেন না। বেশ ক্লান্ত হইয়া রবি এক বৃক্ষের নিচে বসিলেন। আশে পাশে দেখিলেন। বৃক্ষের পিছনের বিশাল দালান। তাহা লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভাবিলেন কোন রাজবাড়ী হইবে। দালানের কারুকার্য দেখিয়া নিজের বাড়ির কথা মনে পড়িলো রবি ঠাকুরের। চোখ বুঁজিয়া তিনি নিজের বাড়ি কে কল্পনা করিতে লাগিলেন। আহা!! কলকাতার সেই ঠাকুর বাড়ি !!! কত কারুকার্য , কত সুন্দর সৃষ্টি !!! কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে !!!
দীর্ঘক্ষন ধরিয়া কল্পনা করিয়া তিনি চক্ষু খুলিলেন। চাহিয়া দেখেন তাঁহার সামনে বেশ কতগুলো টাকা , পয়সা পড়িয়া আছে। একজন জটাধারী ব্যক্তি তাঁহার সামনে দাঁড়াইয়া আরো কিছু ব্যক্তিদের আগমন-প্রস্থান নিয়ন্ত্রন করিতেছেন। একে একে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া কিছু কিছু করিয়া টাকা পয়সা ফেলিয়া যাইতেছে। হঠাৎ এরূপ দৃশ্য দেখিয়া অবাক হইলেন রবি। নরকে আবার এ কিসের উৎপাত !!! নরকেও টাকা পয়সার চল দেখিয়াও আরো অবাক হইলেন।
ইহা কি হইতেছে ? এদিক আইসো" বলিয়া জটাধারী ব্যক্তিকে হাত দিয়া ইশারায় ডাক দিলেন রবি। হঠাৎ করিয়াই তাঁহার ডাক দেখিয়া সেই জটাধারী ব্যক্তি অপেক্ষমান সকলকে কি বলিয়া বিদায় করিয়া দ্রুত রবি ঠাকুরের কাছে আসিয়া বসিলো। টাকা গুনিতে গুনিতে কহিলো - "কথা বার্তা কবেন না। যা ইঙ্কাম হইছে ফিফটি ফিফটি।" এই বলিয়াই রবির হাতে কিছু টাকা গুজিয়া উর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিলো।
আশে পাশের থেকে গুঞ্জন আসিতে লাগিলো - হাইকোর্টের মাজারে দরবেশ বাবা আসিয়াছে।
ইহলোকের জীবনে বহু ভক্তকুল দেখিয়াছেন রবি কিন্তু এরুপ ভক্তকুলের সাক্ষাৎ সেথায় ঘটে নাই। তাই ভয় পাইয়া তিনি উপার্জিত টাকা পয়সা ফেলিয়া রাখিয়াই পালাইয়া বাঁচিলেন ।
কিন্তু যাইবেন কোথায়? এত বড় নরকের বড় বড় রাজপথ , এত নরকবাসি !!! তিনি তাহার সেই জমিদার বাড়িখানা কে বাম দিকে রাখিয়া ডান দিকে হাঁটা আরম্ভ করিলেন। সেদিন নরকের লোকজন রাস্তায় কম কম চলাচল করিতেছে। ডান দিকের রাস্তা ধরিয়া হাঁটা আরম্ভ করিতেই একখানা মোটর গাড়ী চোখে পড়িল । গাড়ী ভর্তি মানুষ , আকাইয়া-বেঁকাইয়া , ঝুলিয়া, ঠাসাঠাসি করিয়া কোথায় যেন যাইতেছে। ভিতরে সুচ পড়িবার জায়গা নাই। আর এক সদ্য কৈশোরে পদার্পন করা কিশোর উক্ত গাড়ীর পাদানি তে ঝুলিতে ঝুলিতে "ছিট খালি , ছিট খালি'' বলিয়া চিৎকার করিতেছে। রবি বুঝিলেন, ইহারা আগের জন্মে চরম পাপ করিয়াছে বলিয়া এই অবস্থা। নিজের সৌভাগ্যের কথা ভাবিতে ভাবিতে আবার হাঁটা আরম্ভ করিলেন তিনি।
কতদূর আসিলেন , বুঝিলেন না। ভাবিলেন এক কোনে বসিয়া বিশ্রাম লইবেন। একখানা খুঁটি ধরিয়া বিশ্রাম লইতে দাঁড়াইবা মাত্র উপর থেকে দৈববাণী শুনিলেন - নারায়ে তাকবীর , আল্লাহু আকবার। ভয়ে খুঁটি ছাড়িয়া উপরে তাকাইয়া দেখিলেন সেথায় একখানা মাইক লাগানো রহিয়াছে। মাইক হইতে কিছুক্ষন পর পর নারায়ে তাকবীর বলিয়া শব্দ আসিতেছে। রবি ঠাকুরের বড় কৌতুহল হইলো। তিনি ধীরে ধীরে শব্দের উৎসমূলের একটু কাছে যাইয়া দেখেন সেথায় অনেক লোক জড় হইয়াছে। সকলেই তাহার ন্যায় আলখাল্লা পড়া। মুখমন্ডলে শুভ্র - কালো দাড়ির ঘনঘটা।
তাহাদের কেউ কেউ মঞ্চে উপবিষ্ট আর বাকীরা নিচে বসিয়া - দাঁড়াইয়া আছেন। রবি দাঁড়াইয়া দেখিতে দেখিতে বক্তৃতা আরম্ভ হইলো। রবি বুঝিলেন, তাহার মর্ত্যলোকের সময়ের ন্যায় নরকেও সাম্প্রদায়িক সমস্যা রহিয়াছে। এখানেও ধর্ম সহজেই ভাঙ্গিয়া পড়ে । এখানেও ধর্ম বড়ই ঠুনকো। ইহারা তাহা মেরামতের লক্ষ্যে এখানে জড়ো হইয়াছে।
ঘুরিয়া আবার পদব্রজে মনোনিবেশ করিলেন। কখনও ডাইনে , কখনও বাঁয়ের পথ ধরিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে কোথায় আসিলেন কহিতে পারিলেন না। ততক্ষনে তাহার পেটের ভিতর ইদুর দৌড়াইতে লাগিল ক্ষুদায়। একখানা শ্রী হীন ভবন দেখিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইলেন। তাহার এখন কোথাও বসিতে ভয় লাগে। পূর্বের ঘটনা মনে করিলেই আর বসিতে পারেন না। তিনি দেখিলেন ভবনটির ভিতরে বাহিরে প্রচুর মানুষ আনাগোনা করিতেছে। বয়ষ্ক মানুষ যেমন রহিয়াছে তেমন অল্প বয়ষ্ক ছোকড়ারাও রহিয়াছে। সকলের মাথাতেই টুপি। ভবনের বাহিরে আসিয়া মেহ মেসওয়াক ক্রয় করিতেছে , কেহ তজবি বা জায়নামাজ ক্রয় করিতেছে। ভবনের সম্মুখে বেশ কিছু দোকান বসাইয়া এরূপ ক্রয় বিক্রয় চলিতেছে।
ভবনটির সামনে গিয়া রবি দাঁড়াইলেন। তাহাকে দেখিয়া আরেকজন মুরুব্বী আসসালামুয়ালাইউকুম বলিয়া হাত বাড়াইয়া দিলেন। রবিও তাহার ন্যায় হাত বাড়াইয়া দিলেন। দুজনের চার দিয়া হ্যান্ড শেক করিলেন ।
- মুরুব্বী ভালো আছেন ? - আগত বয়স্ক ব্যক্তি টি জিজ্ঞাস করিলেন।
- জ্বী জনাব , আমি ভালো। আপনি ? প্রত্যুত্তরে রবি কহিলেন।
- জ্বী , আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ভালো আছি। তা জনাব কী এই কাকরাইল মসজিদের উদ্দেশ্যেই এসেছেন? বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ? আসুন আসুন ভিতরে আসুন। শেষ বয়সে দ্বীনের পথে কাজ করে কিছু সওয়াব নিয়ে যান ।" বলিয়াই রবি ঠাকুরকে টানিয়া লইয়া গেলেন মসজিদের ভিতরে।
ঘটনার আকস্মিকতায় রবি কিছুই কহিতে পারিলেন না।
ভবনটির ভিতরে বিস্তর লোক সমাগম। সকলেই ব্যস্ত সওয়াব হাসিলের জন্য। রবি ঠাকুর ইতস্তত ভাবে ঢুকিলেন। তাঁহার তখন ক্ষুদায় প্রাণ ওষ্ঠাগত ।
কিছুক্ষন পরেই দেখিলেন খাবার সরবরাহ শুরু হইলো। তাঁহার সম্মুখে খাবার ভর্তি বাসন রাখিতেই আরো ৩ জন একত্রে ঝাঁপাইয়া পড়িলো সেই বাসনের উপরে। এরূপ খাবার খাইবার অভ্যাস ইহকালে ছিলো না । অনভ্যস্ততায় বিব্রত করিলেও রবি খাইতে আরম্ভ করিলো।
ক্ষুদার তাড়নায় বিস্তর খাবার খাইয়া পরে দেখিলেন তাঁহার নড়াচড়া করিতে কষ্ট হইতেছে। কিন্তু খাবার গ্রহন হইয়া গিয়াছে, অতঃপর এই স্থানে থাকা আর নিরাপদ মনে করিতেছেন না। এখানে সকলেই প্রত্যেক কার্য করিতেছে সওয়াবের আশায় কিন্তু রবি বুঝিলেন না আসলে সওয়াব বস্তু টা কি।
চুপি চুপি বাহির হইয়া গেলেন ভবনটি হইতে।
ভবন হইতে বাহির হইয়া হাঁটিতে হাঁটিতে ভবনের পিছনে গিয়া দাঁড়াইলেন । সেথায় সবুজ বৃক্ষরাজিতে দখিনা পবন দোল খাইতেছে । ঝরা পাতা ঘাসের কোলে আশ্রয় লইতেছে। নরকেও এমন স্বর্গের ন্যায় উদ্যান !!! আহ স্বর্গে না জানি কত সুন্দর উদ্যান রহিয়াছে। ভাবিয়া ডান পাশে তাকাইতেই দেখিলেন এক ব্যক্তি চিপা হইতে মুত্র ত্যাগ করিয়া বাহির হইতেছে। ভাবিলেন - নরক তো, এরকম কেহ চাইহিলে যত্র তত্র মুত্র ত্যাগ করিতেই পারে।
সেই উদ্যানে কিছুদূর পর পর কংক্রিটের বেঞ্চিতে বসিয়া নারীপুরুষ যুগল হাসি আনন্দে মাতিয়াছে। দেখিয়া রবি'র মন আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া উঠিলো। গুন গুন করিয়া গাহিতে লাগিলেন "বন্ধুর দুইটা চোখ --- প্রেমিক, প্রেমিকার হাত ধরিয়া বসিয়া আসে বেঞ্চিতে আর ঘাড় ঘুরাইয়া এদিক সেদিক তাকাইতেছে, সুযোগ পাইলে অন্য নারীর দিকে লোভতুর দৃষ্টিতে দেখিতেছে। রবি ঠাকুর দেখিয়া মুচকি হাসিতে হাসিতে হাঁটিতে লাগিলেন। হাঁটিয়া ক্লান্ত হইয়া সেই বাগানের এক খালি বেঞ্চিতে বসিলেন।
রবি মর্ত্যলোকে কিছু সঙ্গীত রচনা করিয়াছিলেন । বসিয়া তাহা স্মরন করিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও ব্যার্থ হইলেন।
দেখিতে দেখিতে বেলা গড়াইয়া সন্ধ্যা নামিলো। নরকে জ্বলিয়া উঠিলো হরেক রকমে বাতি। উদ্যানের ভিতরে কয়েক স্থানে বাতি জ্বলিলো, কয়েক স্থানে রহিলো অন্ধকারে। আলো আঁধারি সেই পরিবেশ এক মায়াজাল রচিত করিলো রবি মনে। রবি ব্যাকুল হইয়া কহিল - অপূর্ব !! অপূর্ব !!!
ঠিক তখনই তাঁহার সম্মুখ দিয়া এক যুবক যাইতেছিল। রবির ডাকে সে থমকিয়া দাঁড়াইলো।
- ডাকেন ক্যান ? কি হইসে ? যুবক টি শুধাইলো।
- তাঁহার কথায় থতমত খাইয়া রবি কহিলো - না ইয়ে মানে আমি তোমাকে ডাকিনি বৎস। আমি তো
রবির কথা শেষ হইতে না হইতেই যুবক টি পকেট হইতে ধারালো অস্ত্র বাহির করিয়া কহিলো- "যা আছে ব্যাটা বাইর কর। বুইড়া কালে এই রাইতে পার্কে আইসো খিল্লি খাইতে। তর খিল্লি বাইর করতাছি। "
রবি বুঝিলো এ বুঝি নরকের কোন দেবদূত আসিয়াছে ।
যুবকটি রবি ঠাকুরের শরীর হাতড়াইয়া কিছু না পাইয়া হতাশ হইয়া শাপ শাপান্ত করিতে করিতে চলিয়া গেল।
ঘটনার আকস্মাতিকতায় রবি খানিকক্ষন তব্ধ হইয়া রহিলেন। অতঃপর নানান চিন্তা করিতে করিতে হাঁটা আরম্ভ করিলেন। উদ্যানের ইট বিছানো পথ ধরিয়া , যে দিকে মন চাই সেদিকেই হাঁটিতে লাগিলেন তিনি।
কোন দিক দিয়া আসিয়াছেন , কোথায় আসিয়াছেন কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। বিকট শব্দে তাঁহার ভাবনায় ছেদ পড়িলো। দেখিলেন পাশে অজস্র গাড়ী সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে পথে। উহারা নড়া চড়া করিতেছে না, অপর দিকে পথের অপর পার্শ্বে দুই একটা গাড়ী হুস হাস করিয়া চলিয়া যাইতেছে। অদূরে লাল নীল বাতি জ্বলিতেছে, নিভিতেছে। সেখানে কিছুক্ষন দাড়াইবার পর রবির চক্ষু জ্বালা করিতে করিতে লাগিলো। শ্বাস লইতে কষ্ট হইতে লাগিলো। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া তিনি দ্রুত পা চালাইলেন।
রাস্তার কিনার ধরিয়া হাঁটিতে গিয়ে এর ওর সাথে ধাক্কা খাইতেছেন, কেহ গালমন্দ করিতেছে, কেহ স্যরি বলিয়া দ্রুত প্রস্থান করিতেছে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান বসিয়াছে। একবার ধাক্কা খাইয়া এক দোকানের উপর পড়িয়া যাইতেছিলেন, তৎক্ষণাৎ একজন আসিয়া তাহাকে উদ্ধার করিলো। রবি বুঝিলেন তিনি কোন বাজারের ভিতর আসিয়া পড়িয়াছেন।
বাজার দ্রুত ত্যাগ করিতে দ্রুত বেগে পা চালাইলেন। কোন দিক ঠিক না করিয়া সোজা হাঁটিতে লাগিলেন। হাঁটিতে হাঁটিতে এক স্থানে আসিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন রবি। দেখিলেন সম্মুখে তাঁহার ইহলোকের ঠাকুর বাড়ির ন্যায় কোঁচ গাড়ী , অশ্ব , অশ্ব চালকের মূর্তি। তিনি খুশিতে বিগলিত হইয়া আগাইয়া যাইয়া খুঁটিয়া খুঁটিয়া দেখিতে লাগিলেন। অবিকল তাঁহার ঠাকুর বাড়ির অশ্ব , চালক, অশ্ব চালিত গাড়ীর ন্যায় মূর্তি কেহ যেন এখানে স্থাপন করিয়া গিয়াছে। মূর্তির পিছনে বিশাল ভবন। এক ফাঁকে রবি ভবনের দিকে দেখিলেন। ভবনের এক কোনায় ভবনের নাম অলংকৃত রহিয়াছে। রবি বুঝিলেন উহা তাঁহার ঠাকুর বাড়ির ন্যায় রুপসি বাংলা বাড়ি। কোন জমিদার বাড়ি হইবে।
ওদিকে নরকের সেই স্থান খানি ছিল সর্বাপেক্ষা ব্যস্ত এলাকা। সকলেই উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়াইয়া যাইতেছিল - কেহ পদব্রজে কেহ বা নিজের মোটর গাড়িতে , কেহ বা নরকের বাহনে । তাহারা চলিতে গিয়া দেখিলো একজন বয়স্ক লোক রাস্তার মাঝে অনঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। গাড়ী হইতে কর্কশ শব্দে ভেপু বাজাইতে লাগাইলো। কিন্তু কোন ক্রমেই বয়স্ক ব্যক্তিকে নড়ানো সম্ভব হইলো না । কোন ভেপু তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছিলো না। সে অপলক দৃষ্টিতে এক দিকে তাকাইয়া রহিয়াছে । তাহাকে অতিক্রম করিয়া কোন গাড়ী যাইতে না পারিয়া উক্ত স্থানে যানবাহন আটকা পড়িয়া গেল। দেখিতে দেখিতে তাঁহার চতুর্দিকে গাড়ী ঘিরিয়া আটকাইয়া রহিলো। পুরো নরক জুড়িয়া দেখা দিল বিশাল গাড়ীর জট।
অতঃপর সেই অবস্থা হইতে উদ্ধার করিতে আসিলো নরকের প্রহরী ।
তাহারা টানিয়া লইয়া , হাতকড়া পরাইয়া রবি ঠাকুরকে সেই স্থান হইতে সরাইয়া লইয়া তাহাদের গাড়িতে উঠাইলো। গাড়িতে উঠিবা মাত্রই রবি সম্বিত ফিরিয়া পাইলেন। ক্ষীণ গলায় বলিলেন - আমাকে কোথায় লইয়া যাওয়া হইতেছে ?
একজন ভুঁড়িওয়ালা কিম্ভূতকিমাকার চেহারার প্রহরী বলিলো - "শালার বুইড়া তুই রাস্তা অবরোধ করে মানব বন্ধন করিস, বুঝবি ঠ্যালা । সব বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র । "
রবি ঠ্যালা কি বুঝিলো না। অপেক্ষা করিতে লাগিলো সেই ঠ্যালার জন্যে।
রবি দেখিলেন , তাহাকে বহনকারি সেই গাড়ী "রমনা থানা" নামক এক ভবনে ঢুকিলো। তারপর তাহাকে লোহার গরাদে নিক্ষিপ্ত করা হইলো। রবি কিছু কহিতে চাহিলেন কিন্তু তাঁহার কথায় কেহ কর্নপাত করিলো না।
রবি শুনিলেন - তাঁহার নামে গাড়ী পোড়ানো , পিকেটিং , সরকারি কার্যে বাধাদানের অভিযোগ আনা হইয়াছে। তাঁহার শাস্তির সুপারিশ করা হইয়াছে।
পুনরায় শাস্তির কথা শুনিয়া রবি মূর্ছা গেলেন।
এরুপ চলিতে চলিতে এক সময় ডাক পড়িলো রবি ঠাকুরের। তাহার হিসাবের খাতা খুলিয়া ঈশ্বর অনেক ক্ষন ধরিয়া উলটাইয়া পাল্টাইয়া দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে ঈশ্বর ভ্রূ যুগল কুচকাইলেন। তাহার পর চক্ষু তুলিয়া তাকাইলেন রবি ঠাকুরের দিকে। তারপর বলিলেন "বটে রে ব্যাটা। পৃথিবীতে তো তুমি বেশ ঝামেলাই পাকায়েই এসেছো। তোমাকে তো নরকে যেতেই হবে। নো কম্প্রোমাইজ। নরক ঘুরে আসো তারপর তোমাকে স্বর্গে পাঠানো হইবে"
বলিয়া ঈশ্বর সেই হিসাবের খাতা বন্ধ করিতেই এক দেবদূত কহিলেন - নেক্সট
রবি ঠাকুর কিছু বলিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু তাহার আগেই কয়েকজন দেবদূত তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল চলিল নরকে পাঠাইবে বলিয়া। ঈশ্বরের হুকুম সর্বত্র আইন। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নহে।
এক অন্ধকার কক্ষে রবি ঠাকুর কে লইয়া যাওয়া হইলো। এক দেবদূত ইশারা করিতেই কক্ষের বাতি জ্বলিয়া উঠিল। রবি ঠাকুর দেখিলেন কক্ষের ঠিক মাঝখানে একখানা কাঠাল কাঠের চৌকি। তাহাতে তাহাকে ইশারায় শুইয়া পড়িতে বলিলো আরেক দেবদূত। কোন কথা না বাড়াইয়া সেখানে সোজা হইয়া শুইয়া পড়িলেন তিনি।
শুইবা মাত্রই অচেতন ঘুমে তলাইয়া গেলেন রবি ঠাকুর।
রচন্ড গরমে ঘুম ভাঙ্গিয়া যায় রবি ঠাকুর এর। ঘুম ভাঙ্গিয়া বুঝিতে পারেন শরীরের সাথে তাহার আলখাল্লা শ্বেতকনিকায় ভিজিয়া মাখামাখি হইয়া রহিয়াছে। তন্দ্রা মাখানো আঁখি পল্লব মেলিয়া দেখিলেন তিনি একখানা ছোট কামরার ভিতরে পাতা একখানা মলিন চৌকির উপর শুইয়া রহিয়াছেন। কামরা জুড়িয়া শুধু এই চৌকিখানা। এক কোনে একখানা তিন পায়া টেবিল কোনমতে দাঁড়া করাইয়া রাখা। কামরা খানার এক পার্শ্বের দেয়ালে ছোট একখানা জানালাও রহিয়াছে কিন্তু তাহার কপাট ভিতর স্থায়ীভাবেই আটকাইয়া দেয়া হইয়াছে। উপরে টিনের চাল।
আধাপাকা কক্ষটির এক পাশে ভাঙ্গা দরজা। দরজার ভিতর শতখানেক ছিদ্র দিয়া ওপাশ হইতে তীক্ষ্ণ আলো প্রবেশ করিয়া কক্ষের ভিতর এক আলো আঁধারি পরিবেশ রচনা করিয়াছে। এসব দেখিতে দেখিতে রবি ঠাকুরের হঠাৎ খেয়াল হইলো তাঁহাকে তো নরকে পাঠানো হইয়াছে। "তো ইহাই সেই নরক" - একা একা বিড় বিড় করিয়া বলিলেন।
চৌকি হইতে রবি উঠিয়া বসিলেন। প্রচুর জল তেষ্টা পাইয়াছে তাহার। কিন্তু আশে পাশে কোন কলস বা পানির পাত্র দেখিলেন না। নিজের স্ত্রীর নাম ধরিয়া ডাকিতে গিয়াও থামিয়া গেলেন তিনি। ইহা তো নরক, তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য স্ত্রী বা কোন দাস দাসি থাকিবার কথা না। অভ্যাসবশতঃ চৌকির নিচে খড়ম খুজিতে গেলেন। দেখিলেন একখানা প্লাস্টিকের চপ্পল রহিয়াছে সেখানে। অগিত্যা সেটিই পায়ে গলিয়ে চৌকি হইতে নামিয়া দাড়াইলেন।
সেই ছিদ্র ওয়ালা দরজার কপাট খুলিলেন। বাহিরে এপাশ ওপাশ তাকাইলেন। দেখিলেন তাঁহার কক্ষের ন্যায় সারি সারি কক্ষ , সারি সারি দরজা রহিয়াছে সেখানে। খুব মনযোগ দিয়া খুটাইয়া খুটাইয়া রবি, নরকের কক্ষ গুলি দেখিতে লাগিলেন। আশে পাশে মাঝে মধ্যে কদাচিৎ লোক জন দ্রুত বেগে পার হইয়া যাইতেছে। কেউ হয়তো এক ঝলক তাকাইয়া দেখিয়া লইতেছে, কেউ খেয়াল করিতেছে না।
হাঁটিতে হাঁটিতে রবি সেই সারিবদ্ধ ঘর গুলোর একদম এক কোনায় চলিয়া আসিলেন। সেথায় সেই শেষ অংশে বিশাল লোকের জটলা। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে তারঃস্বরে চিৎকার করিতেছে, হাতে কলস , বালতি লইয়া ঠেলা ঠেলি করিতেছে। এসব দেখিয়া রবি কৌতূহল নিয়া একটু উঁকি দিয়া তাকাইতেই দেখিলেন একখানা সরু নল হইতে জল আসিতেছে আর সেই নলের নিচে কে কখন বালতি, কলস দিবে তা নিয়া যুদ্ধ চলিতেছে। জল দেখিয়াই তেষ্টা আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠিলো। এক ব্যাক্তি, উদোম গা , লুঙ্গি ভাঁজ করে বাঁধা, বালতি ভরিয়া জল লইয়া যাইতেছিল। তাহাকে ডাকিয়া রবি ঠাকুর কহিল - "একটু জল দিবে বাপু ? "
- জল ? ঐ মিয়া পানিরে জল কন ক্যালা ? ডিশ দেইখা বুইড়া কালে ভিমরতি ধরছে ? বলিয়া খ্যাক খ্যাক করিতে করিতে বালতি লইয়া চলিয়া গেল। রবি বাবু তাহার পথের দিকে চাহিয়া রহিলেন কিছু ক্ষন।
কোন রকম জলতেষ্টা নিবারন করিয়া রবি বের হইলেন নরক দর্শনে। আস্তে আস্তে হাঁটিতে হাঁটিতে প্রধান ফটক পার হইলেন।
ফটক পার হইতেই চতুর্দিকে প্রচন্ড শব্দ , গাড়ীর হর্ন বাজিতেছে, মাইকে করিয়া কে যেন ''খাউজানির মলম" বিক্রির বিজ্ঞাপন করিতেছে। রবি ঠাকুর খানিকটা ভয় পাইয়া গেলেন এসব দেখিয়া। একটু আগাইতেই নাকে কটু দূর্গন্ধ আসিয়া ধাক্কা দিল। ডান দিকে তাকাইয়া দেখিলেন ময়লার স্তুপ। ভাবিলেন, স্বর্গ হইতে এসব ময়লা আনিয়া নরকে স্তুপ করা হয়।
নরকে এত মানুষ , এত গাড়ী, এমন কি রিকশাও দেখিয়া বড়ই অবাক হইলেন রবি। সেথায় পাকা রাস্তা, দোকানপাট, ঘরবাড়ি পর্যন্ত রহিয়াছে। এসব ভাবিতে ভাবিতে হাটিতেছেন , হঠাৎ করিয়াই দোকান গুলোর সাইনবোর্ড দেখিয়া থমকাইয়া গেলেন। এখানেও বাংলা !!! দেখিয়াই বড় আহ্লাদিত হইলেন তিনি। এখানেও বাংলা প্রচলিত !!! তাঁহার নোবেল পুরষ্কারের কল্যাণে বাংলা এখন নরক পর্যন্ত পৌছাইয়াছে। দেখিলেন এক দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা রহিয়াছে " জামাই বউ পাদুকা বিতান - চানখার পুল, ঢাকা" দেখিয়া কৌতুক অনুভব করিলেন তিনি।
তাঁহার কোন উদ্দেশ্য নাই, কোন তাড়া নাই। যেদিন মন চাহিতেছে , সেদিকেই হাঁটিতেছেন রবি। নরকের মানুষদের কার্যকলাপ দেখিয়া বড়ই আনন্দ অনুভব করিতেছেন। যাহার মন চাহিতেছে বড় রাস্তার পাশে বসিয়া মুত্র ত্যাগ করিতেছে, যেখানে খুশী সেখানে আবর্জনা ফেলিতেছে। উচ্চঃস্বরে মাইক বাজিতেছে। হাঁটিতে হাঁটিতে হঠাৎ করিয়া এক খানা গান তাঁহার কানে আসিলো। গান শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলেন। এ দেখি বাংলা ভাষায় গান বাজিতেছে !!!
গানটা তাঁহার বুকের ভিতর বাঁধিয়া গেল। গুন গুন করিয়া গাহিতে গাহিতে হাঁটিতে লাগিলেন। গুন গুন করিয়া রবি গাহিতে লাগিলো "বন্ধুর দুইটা চোখ , যেন দুই নলা বন্দুক, গুল্লি মাইরা ভাঙ্গো আমার মনেরও সিন্দুক"।
কতক্ষন হাটিলেন ঠিক ঠাওর করিতে পারিলেন না। বেশ ক্লান্ত হইয়া রবি এক বৃক্ষের নিচে বসিলেন। আশে পাশে দেখিলেন। বৃক্ষের পিছনের বিশাল দালান। তাহা লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভাবিলেন কোন রাজবাড়ী হইবে। দালানের কারুকার্য দেখিয়া নিজের বাড়ির কথা মনে পড়িলো রবি ঠাকুরের। চোখ বুঁজিয়া তিনি নিজের বাড়ি কে কল্পনা করিতে লাগিলেন। আহা!! কলকাতার সেই ঠাকুর বাড়ি !!! কত কারুকার্য , কত সুন্দর সৃষ্টি !!! কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে !!!
দীর্ঘক্ষন ধরিয়া কল্পনা করিয়া তিনি চক্ষু খুলিলেন। চাহিয়া দেখেন তাঁহার সামনে বেশ কতগুলো টাকা , পয়সা পড়িয়া আছে। একজন জটাধারী ব্যক্তি তাঁহার সামনে দাঁড়াইয়া আরো কিছু ব্যক্তিদের আগমন-প্রস্থান নিয়ন্ত্রন করিতেছেন। একে একে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া কিছু কিছু করিয়া টাকা পয়সা ফেলিয়া যাইতেছে। হঠাৎ এরূপ দৃশ্য দেখিয়া অবাক হইলেন রবি। নরকে আবার এ কিসের উৎপাত !!! নরকেও টাকা পয়সার চল দেখিয়াও আরো অবাক হইলেন।
ইহা কি হইতেছে ? এদিক আইসো" বলিয়া জটাধারী ব্যক্তিকে হাত দিয়া ইশারায় ডাক দিলেন রবি। হঠাৎ করিয়াই তাঁহার ডাক দেখিয়া সেই জটাধারী ব্যক্তি অপেক্ষমান সকলকে কি বলিয়া বিদায় করিয়া দ্রুত রবি ঠাকুরের কাছে আসিয়া বসিলো। টাকা গুনিতে গুনিতে কহিলো - "কথা বার্তা কবেন না। যা ইঙ্কাম হইছে ফিফটি ফিফটি।" এই বলিয়াই রবির হাতে কিছু টাকা গুজিয়া উর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিলো।
আশে পাশের থেকে গুঞ্জন আসিতে লাগিলো - হাইকোর্টের মাজারে দরবেশ বাবা আসিয়াছে।
ইহলোকের জীবনে বহু ভক্তকুল দেখিয়াছেন রবি কিন্তু এরুপ ভক্তকুলের সাক্ষাৎ সেথায় ঘটে নাই। তাই ভয় পাইয়া তিনি উপার্জিত টাকা পয়সা ফেলিয়া রাখিয়াই পালাইয়া বাঁচিলেন ।
কিন্তু যাইবেন কোথায়? এত বড় নরকের বড় বড় রাজপথ , এত নরকবাসি !!! তিনি তাহার সেই জমিদার বাড়িখানা কে বাম দিকে রাখিয়া ডান দিকে হাঁটা আরম্ভ করিলেন। সেদিন নরকের লোকজন রাস্তায় কম কম চলাচল করিতেছে। ডান দিকের রাস্তা ধরিয়া হাঁটা আরম্ভ করিতেই একখানা মোটর গাড়ী চোখে পড়িল । গাড়ী ভর্তি মানুষ , আকাইয়া-বেঁকাইয়া , ঝুলিয়া, ঠাসাঠাসি করিয়া কোথায় যেন যাইতেছে। ভিতরে সুচ পড়িবার জায়গা নাই। আর এক সদ্য কৈশোরে পদার্পন করা কিশোর উক্ত গাড়ীর পাদানি তে ঝুলিতে ঝুলিতে "ছিট খালি , ছিট খালি'' বলিয়া চিৎকার করিতেছে। রবি বুঝিলেন, ইহারা আগের জন্মে চরম পাপ করিয়াছে বলিয়া এই অবস্থা। নিজের সৌভাগ্যের কথা ভাবিতে ভাবিতে আবার হাঁটা আরম্ভ করিলেন তিনি।
কতদূর আসিলেন , বুঝিলেন না। ভাবিলেন এক কোনে বসিয়া বিশ্রাম লইবেন। একখানা খুঁটি ধরিয়া বিশ্রাম লইতে দাঁড়াইবা মাত্র উপর থেকে দৈববাণী শুনিলেন - নারায়ে তাকবীর , আল্লাহু আকবার। ভয়ে খুঁটি ছাড়িয়া উপরে তাকাইয়া দেখিলেন সেথায় একখানা মাইক লাগানো রহিয়াছে। মাইক হইতে কিছুক্ষন পর পর নারায়ে তাকবীর বলিয়া শব্দ আসিতেছে। রবি ঠাকুরের বড় কৌতুহল হইলো। তিনি ধীরে ধীরে শব্দের উৎসমূলের একটু কাছে যাইয়া দেখেন সেথায় অনেক লোক জড় হইয়াছে। সকলেই তাহার ন্যায় আলখাল্লা পড়া। মুখমন্ডলে শুভ্র - কালো দাড়ির ঘনঘটা।
তাহাদের কেউ কেউ মঞ্চে উপবিষ্ট আর বাকীরা নিচে বসিয়া - দাঁড়াইয়া আছেন। রবি দাঁড়াইয়া দেখিতে দেখিতে বক্তৃতা আরম্ভ হইলো। রবি বুঝিলেন, তাহার মর্ত্যলোকের সময়ের ন্যায় নরকেও সাম্প্রদায়িক সমস্যা রহিয়াছে। এখানেও ধর্ম সহজেই ভাঙ্গিয়া পড়ে । এখানেও ধর্ম বড়ই ঠুনকো। ইহারা তাহা মেরামতের লক্ষ্যে এখানে জড়ো হইয়াছে।
ঘুরিয়া আবার পদব্রজে মনোনিবেশ করিলেন। কখনও ডাইনে , কখনও বাঁয়ের পথ ধরিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে কোথায় আসিলেন কহিতে পারিলেন না। ততক্ষনে তাহার পেটের ভিতর ইদুর দৌড়াইতে লাগিল ক্ষুদায়। একখানা শ্রী হীন ভবন দেখিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইলেন। তাহার এখন কোথাও বসিতে ভয় লাগে। পূর্বের ঘটনা মনে করিলেই আর বসিতে পারেন না। তিনি দেখিলেন ভবনটির ভিতরে বাহিরে প্রচুর মানুষ আনাগোনা করিতেছে। বয়ষ্ক মানুষ যেমন রহিয়াছে তেমন অল্প বয়ষ্ক ছোকড়ারাও রহিয়াছে। সকলের মাথাতেই টুপি। ভবনের বাহিরে আসিয়া মেহ মেসওয়াক ক্রয় করিতেছে , কেহ তজবি বা জায়নামাজ ক্রয় করিতেছে। ভবনের সম্মুখে বেশ কিছু দোকান বসাইয়া এরূপ ক্রয় বিক্রয় চলিতেছে।
ভবনটির সামনে গিয়া রবি দাঁড়াইলেন। তাহাকে দেখিয়া আরেকজন মুরুব্বী আসসালামুয়ালাইউকুম বলিয়া হাত বাড়াইয়া দিলেন। রবিও তাহার ন্যায় হাত বাড়াইয়া দিলেন। দুজনের চার দিয়া হ্যান্ড শেক করিলেন ।
- মুরুব্বী ভালো আছেন ? - আগত বয়স্ক ব্যক্তি টি জিজ্ঞাস করিলেন।
- জ্বী জনাব , আমি ভালো। আপনি ? প্রত্যুত্তরে রবি কহিলেন।
- জ্বী , আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ভালো আছি। তা জনাব কী এই কাকরাইল মসজিদের উদ্দেশ্যেই এসেছেন? বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ? আসুন আসুন ভিতরে আসুন। শেষ বয়সে দ্বীনের পথে কাজ করে কিছু সওয়াব নিয়ে যান ।" বলিয়াই রবি ঠাকুরকে টানিয়া লইয়া গেলেন মসজিদের ভিতরে।
ঘটনার আকস্মিকতায় রবি কিছুই কহিতে পারিলেন না।
ভবনটির ভিতরে বিস্তর লোক সমাগম। সকলেই ব্যস্ত সওয়াব হাসিলের জন্য। রবি ঠাকুর ইতস্তত ভাবে ঢুকিলেন। তাঁহার তখন ক্ষুদায় প্রাণ ওষ্ঠাগত ।
কিছুক্ষন পরেই দেখিলেন খাবার সরবরাহ শুরু হইলো। তাঁহার সম্মুখে খাবার ভর্তি বাসন রাখিতেই আরো ৩ জন একত্রে ঝাঁপাইয়া পড়িলো সেই বাসনের উপরে। এরূপ খাবার খাইবার অভ্যাস ইহকালে ছিলো না । অনভ্যস্ততায় বিব্রত করিলেও রবি খাইতে আরম্ভ করিলো।
ক্ষুদার তাড়নায় বিস্তর খাবার খাইয়া পরে দেখিলেন তাঁহার নড়াচড়া করিতে কষ্ট হইতেছে। কিন্তু খাবার গ্রহন হইয়া গিয়াছে, অতঃপর এই স্থানে থাকা আর নিরাপদ মনে করিতেছেন না। এখানে সকলেই প্রত্যেক কার্য করিতেছে সওয়াবের আশায় কিন্তু রবি বুঝিলেন না আসলে সওয়াব বস্তু টা কি।
চুপি চুপি বাহির হইয়া গেলেন ভবনটি হইতে।
ভবন হইতে বাহির হইয়া হাঁটিতে হাঁটিতে ভবনের পিছনে গিয়া দাঁড়াইলেন । সেথায় সবুজ বৃক্ষরাজিতে দখিনা পবন দোল খাইতেছে । ঝরা পাতা ঘাসের কোলে আশ্রয় লইতেছে। নরকেও এমন স্বর্গের ন্যায় উদ্যান !!! আহ স্বর্গে না জানি কত সুন্দর উদ্যান রহিয়াছে। ভাবিয়া ডান পাশে তাকাইতেই দেখিলেন এক ব্যক্তি চিপা হইতে মুত্র ত্যাগ করিয়া বাহির হইতেছে। ভাবিলেন - নরক তো, এরকম কেহ চাইহিলে যত্র তত্র মুত্র ত্যাগ করিতেই পারে।
সেই উদ্যানে কিছুদূর পর পর কংক্রিটের বেঞ্চিতে বসিয়া নারীপুরুষ যুগল হাসি আনন্দে মাতিয়াছে। দেখিয়া রবি'র মন আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া উঠিলো। গুন গুন করিয়া গাহিতে লাগিলেন "বন্ধুর দুইটা চোখ --- প্রেমিক, প্রেমিকার হাত ধরিয়া বসিয়া আসে বেঞ্চিতে আর ঘাড় ঘুরাইয়া এদিক সেদিক তাকাইতেছে, সুযোগ পাইলে অন্য নারীর দিকে লোভতুর দৃষ্টিতে দেখিতেছে। রবি ঠাকুর দেখিয়া মুচকি হাসিতে হাসিতে হাঁটিতে লাগিলেন। হাঁটিয়া ক্লান্ত হইয়া সেই বাগানের এক খালি বেঞ্চিতে বসিলেন।
রবি মর্ত্যলোকে কিছু সঙ্গীত রচনা করিয়াছিলেন । বসিয়া তাহা স্মরন করিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও ব্যার্থ হইলেন।
দেখিতে দেখিতে বেলা গড়াইয়া সন্ধ্যা নামিলো। নরকে জ্বলিয়া উঠিলো হরেক রকমে বাতি। উদ্যানের ভিতরে কয়েক স্থানে বাতি জ্বলিলো, কয়েক স্থানে রহিলো অন্ধকারে। আলো আঁধারি সেই পরিবেশ এক মায়াজাল রচিত করিলো রবি মনে। রবি ব্যাকুল হইয়া কহিল - অপূর্ব !! অপূর্ব !!!
ঠিক তখনই তাঁহার সম্মুখ দিয়া এক যুবক যাইতেছিল। রবির ডাকে সে থমকিয়া দাঁড়াইলো।
- ডাকেন ক্যান ? কি হইসে ? যুবক টি শুধাইলো।
- তাঁহার কথায় থতমত খাইয়া রবি কহিলো - না ইয়ে মানে আমি তোমাকে ডাকিনি বৎস। আমি তো
রবির কথা শেষ হইতে না হইতেই যুবক টি পকেট হইতে ধারালো অস্ত্র বাহির করিয়া কহিলো- "যা আছে ব্যাটা বাইর কর। বুইড়া কালে এই রাইতে পার্কে আইসো খিল্লি খাইতে। তর খিল্লি বাইর করতাছি। "
রবি বুঝিলো এ বুঝি নরকের কোন দেবদূত আসিয়াছে ।
যুবকটি রবি ঠাকুরের শরীর হাতড়াইয়া কিছু না পাইয়া হতাশ হইয়া শাপ শাপান্ত করিতে করিতে চলিয়া গেল।
ঘটনার আকস্মাতিকতায় রবি খানিকক্ষন তব্ধ হইয়া রহিলেন। অতঃপর নানান চিন্তা করিতে করিতে হাঁটা আরম্ভ করিলেন। উদ্যানের ইট বিছানো পথ ধরিয়া , যে দিকে মন চাই সেদিকেই হাঁটিতে লাগিলেন তিনি।
কোন দিক দিয়া আসিয়াছেন , কোথায় আসিয়াছেন কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। বিকট শব্দে তাঁহার ভাবনায় ছেদ পড়িলো। দেখিলেন পাশে অজস্র গাড়ী সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে পথে। উহারা নড়া চড়া করিতেছে না, অপর দিকে পথের অপর পার্শ্বে দুই একটা গাড়ী হুস হাস করিয়া চলিয়া যাইতেছে। অদূরে লাল নীল বাতি জ্বলিতেছে, নিভিতেছে। সেখানে কিছুক্ষন দাড়াইবার পর রবির চক্ষু জ্বালা করিতে করিতে লাগিলো। শ্বাস লইতে কষ্ট হইতে লাগিলো। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া তিনি দ্রুত পা চালাইলেন।
রাস্তার কিনার ধরিয়া হাঁটিতে গিয়ে এর ওর সাথে ধাক্কা খাইতেছেন, কেহ গালমন্দ করিতেছে, কেহ স্যরি বলিয়া দ্রুত প্রস্থান করিতেছে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান বসিয়াছে। একবার ধাক্কা খাইয়া এক দোকানের উপর পড়িয়া যাইতেছিলেন, তৎক্ষণাৎ একজন আসিয়া তাহাকে উদ্ধার করিলো। রবি বুঝিলেন তিনি কোন বাজারের ভিতর আসিয়া পড়িয়াছেন।
বাজার দ্রুত ত্যাগ করিতে দ্রুত বেগে পা চালাইলেন। কোন দিক ঠিক না করিয়া সোজা হাঁটিতে লাগিলেন। হাঁটিতে হাঁটিতে এক স্থানে আসিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন রবি। দেখিলেন সম্মুখে তাঁহার ইহলোকের ঠাকুর বাড়ির ন্যায় কোঁচ গাড়ী , অশ্ব , অশ্ব চালকের মূর্তি। তিনি খুশিতে বিগলিত হইয়া আগাইয়া যাইয়া খুঁটিয়া খুঁটিয়া দেখিতে লাগিলেন। অবিকল তাঁহার ঠাকুর বাড়ির অশ্ব , চালক, অশ্ব চালিত গাড়ীর ন্যায় মূর্তি কেহ যেন এখানে স্থাপন করিয়া গিয়াছে। মূর্তির পিছনে বিশাল ভবন। এক ফাঁকে রবি ভবনের দিকে দেখিলেন। ভবনের এক কোনায় ভবনের নাম অলংকৃত রহিয়াছে। রবি বুঝিলেন উহা তাঁহার ঠাকুর বাড়ির ন্যায় রুপসি বাংলা বাড়ি। কোন জমিদার বাড়ি হইবে।
ওদিকে নরকের সেই স্থান খানি ছিল সর্বাপেক্ষা ব্যস্ত এলাকা। সকলেই উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়াইয়া যাইতেছিল - কেহ পদব্রজে কেহ বা নিজের মোটর গাড়িতে , কেহ বা নরকের বাহনে । তাহারা চলিতে গিয়া দেখিলো একজন বয়স্ক লোক রাস্তার মাঝে অনঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। গাড়ী হইতে কর্কশ শব্দে ভেপু বাজাইতে লাগাইলো। কিন্তু কোন ক্রমেই বয়স্ক ব্যক্তিকে নড়ানো সম্ভব হইলো না । কোন ভেপু তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছিলো না। সে অপলক দৃষ্টিতে এক দিকে তাকাইয়া রহিয়াছে । তাহাকে অতিক্রম করিয়া কোন গাড়ী যাইতে না পারিয়া উক্ত স্থানে যানবাহন আটকা পড়িয়া গেল। দেখিতে দেখিতে তাঁহার চতুর্দিকে গাড়ী ঘিরিয়া আটকাইয়া রহিলো। পুরো নরক জুড়িয়া দেখা দিল বিশাল গাড়ীর জট।
অতঃপর সেই অবস্থা হইতে উদ্ধার করিতে আসিলো নরকের প্রহরী ।
তাহারা টানিয়া লইয়া , হাতকড়া পরাইয়া রবি ঠাকুরকে সেই স্থান হইতে সরাইয়া লইয়া তাহাদের গাড়িতে উঠাইলো। গাড়িতে উঠিবা মাত্রই রবি সম্বিত ফিরিয়া পাইলেন। ক্ষীণ গলায় বলিলেন - আমাকে কোথায় লইয়া যাওয়া হইতেছে ?
একজন ভুঁড়িওয়ালা কিম্ভূতকিমাকার চেহারার প্রহরী বলিলো - "শালার বুইড়া তুই রাস্তা অবরোধ করে মানব বন্ধন করিস, বুঝবি ঠ্যালা । সব বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র । "
রবি ঠ্যালা কি বুঝিলো না। অপেক্ষা করিতে লাগিলো সেই ঠ্যালার জন্যে।
রবি দেখিলেন , তাহাকে বহনকারি সেই গাড়ী "রমনা থানা" নামক এক ভবনে ঢুকিলো। তারপর তাহাকে লোহার গরাদে নিক্ষিপ্ত করা হইলো। রবি কিছু কহিতে চাহিলেন কিন্তু তাঁহার কথায় কেহ কর্নপাত করিলো না।
রবি শুনিলেন - তাঁহার নামে গাড়ী পোড়ানো , পিকেটিং , সরকারি কার্যে বাধাদানের অভিযোগ আনা হইয়াছে। তাঁহার শাস্তির সুপারিশ করা হইয়াছে।
পুনরায় শাস্তির কথা শুনিয়া রবি মূর্ছা গেলেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন