বয়ে চলা জীবন কাব্যের পান্ডুলিপি


আমার নিজস্ব ব্লগে স্বাগতম । এটা শুধু আমার ব্লগ না , বরং আমি আমার সব প্রিয় জিনিস গুলোকে একত্রে বেঁধেছি এখানে। তাই এটা শুধু ব্লগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি , হয়ে উঠেছে আমার ও আরো কয়েকটি অনলাইনের লিঙ্কগুলোর মিলন মেলা ।

মুলতঃ আমারব্লগে ও সামহ্যোয়ারইনব্লগে লিখেই শুরু তারপর আমার ব্লগে বড় একটা সময় কাটিয়েছি হাবিজাবি লিখে লিখে। সেখান থেকেই কিছু কিছু লেখা, আমরাবন্ধু তে লেখা কিছু লেখা এখানে সন্নিবেশিত করেছি।

লেখা লেখির জন্য যে মেধা দরকার, সেটা আমার নাই, তাই অকপটে স্বীকার করতেও সমস্যা নাই আমার। এই মেধাহীন লেখাগুলোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অপপ্রয়াস মাত্র।


বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

দেভদাস

বিমানের আসনে বসিয়া দেভু নিজের নখ নিজে কামড়াইতেছিল। বিমান বলিলে অনেকে আবার বাংলাদেশ বিমান মনে করিয়া থাকে। উহা বাংলাদেশ বিমান নহে, বিদেশী কোন এক বিমান হইবে। বিমান ঢাকার আকাশে ঢুকিয়াছে, কিছুক্ষনের মধ্যেই বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করিবে। দেভু জানালা দিয়া ঢাকার আকাশ দেখিতেছিলো। তাহার মন অসম্ভব রকমের ভার হইয়া আছে। বিলাত ওরফে লন্ডনে ১০ বৎসর কাটাইয়া দেশে আসিয়াছে। অনেক চেষ্টা করিয়াছিলো বিলাতেই থাকিয়া যাইবে। কিন্তু কপালে ছিলো না বলিয়া আর থাকা হইলো না, বরং তাহাকে এক প্রকার জোর করিয়াই দেশে ফেরত পাঠাইয়া দেয়া হইলো। স্টুডেন্ট ভিসা লইয়া দেভু বিলাতে পাড়ি জমাইয়াছিলো। ভাবিয়াছিলো, অন্য সকলের ন্যায় পড়ায় ফাঁকি দিয়া, ছাত্র জীবন লম্বা করিয়া এক সময় ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদন করিবে । নয়-দশ বছর বিলাতে কাটাইয়া এই আবেদন করিলে নাকি বিলাতবাসি হইয়া যাওয়া যায়। কিন্তু তাহার কাগজে কি সব খুঁত দেখিতে পাইয়া বিলাতের সরকার তাহা প্রত্যাখ্যান তো করিলোই উপরন্ত তাহাকে দেশে ফিরিয়া যাইবার সময় বাঁধিয়া দিল। মনঃক্ষুন্ন হইয়া দেভু তাই নিতান্তই অনিচ্ছা স্বত্বেও দেশে ফিরিতেছে। 

দেশে আসিবার আগেই শুনিয়াছে এখানে ভয়াবহ লোড শেডিং, ট্রাফিক জ্যাম, এই কয় বছরে আরো নোংরা হইয়াছে শহর। ভাবিতে ভাবিতে একা একাই ''শিট" বলিয়া উঠিলো। পাশ দিয়া তখন বিমানবালা হাঁটিয়া যাইতেছিলো, দেভুর কন্ঠে শিট শুনিয়া চমকাইয়া তাকাইলো। বিমানবন্দর হইতে বাহির হইতেই দেখিলে দেভুর পিতা মাতা বড় ভাই একখানা মাইক্রোবাস ভাড়া করিয়া আনিয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে লোহার বেড়ার ভিতরে। বেড়ার বাহিরে অজস্র মানুষ। বাহির হইতে সবাই তাকাইয়া রহিয়াছে ভিতরে। নিজেকে চিড়িয়াখানার পশু বলিয়া মনে হইতেছিলো তাহার। আর বাহিরে দাঁড়ানো লোক গুলি তাহাকে ঢাকা চিড়িয়াখানার প্রথম খাঁচার প্রাণী মনে কড়িয়া দেখিতেছিলো। 

সে যাহাই হউক, কোন রকমে মাইক্রোবাসে উঠিয়া বন্দর এলাকা ত্যাগ করিলো তাহারা। ঢাকার জিগাতলাতে দেভুদের বাসা। সে বিলাত যাইবার পূর্বে উহা একতলা টিনশেড ছিলো, পরে দেভুর বাবা বুদ্ধি করিয়া ডেভেলপার কে দিয়া উহা বহতল ভবন করাইয়া লইয়াছে। উক্ত ভবনের দুই তলায় তাহার বসবাস করে। তাহাদের ভাগে বাকী যে ফ্ল্যাটগুলো পড়িয়াছে, তাহা ভাড়া দিয়া দেভুর পিতা এক পদের উপর আরেক পদ রাখিয়া দিন পার করিতেছে। দেভু ফিরিয়া আসাতে কিঞ্চিত মনঃক্ষুন্ন হইলেও খোদা যাহা করেন, মঙ্গলের জন্য করেন ভাবিয়া নিশ্চুপ রহিয়াছেন। তাহাদের মাইক্রোবাস খানি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক ট্রাফিক জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকাইয়া রহিয়াছে। দেভুর মা তাতেও খুশী, এতদিন পর পুত্রকে কাছে পাইয়া। দেভুর পিতা চিন্তিত মুখে বাহিরে লোকজনের চলাচল দেখিতেছে। আর দেভু কিছুক্ষন পর পর বিড় বিড় কড়িয়া "ওহ শিট ম্যান" বলিতেছে। 

 বসিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ করিয়া তাহার পারুর কথা মনে পড়িলো। - পারুরা কেমন আছে মা ? তাহার মা'র দিকে ঘাড় ঘুরাইয়া জিজ্ঞাস করিলো। দেভুর মা পারুর সহিত দেভুর ঈষৎ টাঙ্কি মারার ঘটনা জানিতো। হঠাৎ করিয়া পারুর কথা শুনিয়া মুখখানি ডেকোরেটরের পাতিলের ন্যায় করিয়া উদাস হইয়া কহিলো - ভালৈ আছে মনে হয়। পারুদের বাসা ছিলো দেভুদের বাসার সম্মুখেই। দেভু তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়িতেছিল। দেভু সময় পাইলেই পারুর সহিত টাঙ্কি মারিত। তাহাদের টিনের চালে ঢিল মারিতো। তাহাদের বাড়ির চালে উঠিয়া পারুর জন্য অপেক্ষা করিতো। পারু কে দেখিলে মুচকি হাসিতো । জবাবে পারুও ইশকুল হইতে আসিবার বা যাইবার পথে দেভুর সহিত দেখা হইলে আড় চোখে দেখিতো আর মিট মিট কড়িয়া হাসিতো। কখনও বা তাহার কোন বান্ধবী টিপ্পনি কাটিতো। 

বিলাতে থাকিতে একটিবারের জন্যেও পারুর কথা তাহার মনে আসে নাই। আজ হঠাৎ কি ভাবিয়া তাহার কথা ভাবিতে লাগিলো। পারুর সেই শ্যাম বর্ণ চেহারার কথা ভাবিতে ভাবিতে তাহারা জিগাতলা আসিয়া পৌছাইলো। 

 ২ 

 দেভু তাঁহার পিতা মাতা সহ জিগাতলার বাড়িতে আসিয়া পৌছাইলো। গাড়ী হইতে নামিয়া বিস্ময়ে চারিদিকে দেখিতে লাগিলো। চারি পাশে উঁচু উঁচু দালান। সব বাড়ির গ্রিলের ডিজাইন একই, বাড়িগুলার ডিজাইন বাহির হইতে দেখিতে একই রকম । সামান্য উনিশ-বিশ আর কি !!! বেলা না গড়াইতেই সুর্যালোক ঢাকিয়া গিয়াছে। ফুটপাতে সেই আগের মতই টং দোকান, আর মানুষ ফুটপাত ছাড়িয়া রাস্তা দিয়া হাটিয়া যাইতেছে। সেই মানব স্রোতের ভিতর দিয়া ঠেলিয়া রিকশা কিংবা ছোট গাড়ী কোনক্রমে যাইতেছে। এই দশ বছরে এই শহরে যেন কয়েক সহস্রাধিক গুন লোকসংখ্যা বাড়িয়াছে। দেভু তাহাদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করিলো। ঝা চক চকে মেঝে, কারুকার্য মন্ডিত সদর দরজা। দেখিয়াই তাঁহার আত্মা ভরিয়া গেল। সদর দরজা পেরিয়ে বসার ঘর। তাহাতে সব চাইনিজ সৌন্দর্য সামগ্রী দিয়া ঠাসা। দেখিলে মনে হইবে জাদুঘর। সব দেখিয়া শেষে দেভু তাঁহার জন্য বরাদ্দ করা কক্ষটিতে প্রবেশ করিলো। স্নান করিয়া, নাস্তা খাইয়া দেভু তাঁহার ল্যাপটপ খানি খুলিলো। 

আসিবার আগেই সে আন্তর্জাল এর ব্যবস্থা করিতে বলিয়াছিলো তাঁহার অগ্রজ ভ্রাতা কে। সে সেই মোতাবেক মোডেম কিনিয়া দেভু কে দিয়া গিয়াছে। দেভু মোডেম লাগাইয়া তাহার প্রাথমিক কাজ সমাধা করিয়া প্রথমেই ফেসবুক খুলিলো। দেখিলো তাঁহার অগনিত বিলাতি বান্ধবী তাঁহার পূর্বের বিলাত হইতে যাওয়া মূলক স্ট্যাটাস খানিতে "মিস ইউ ডেভ, মিস ইউ ডেভ" লিখিয়া ভরাইয়া ফেলিয়াছে। কেহ আবার চুম্বনের ইমো প্রদান করিয়াছে , মন্তব্যের সহিত। তাহাকে সকলে এত মিস করিয়াছে দেখিয়া খুশী হইলো দেভু। বিলাত যাইয়া দেভু নিজের নাম বদলাইয়া ডেভ ড্যাস রাখিয়াছিল। তাহা উচ্চারনের ত্রুটির কারণে দেভজ নামে প্রচলিত হইছিলো। দেশে থাকিতে সকলে তাহাকে দেব দাস ওরফে দেব বলিয়া ডাকিতো সকলেই। কালের বিবর্তনে এখন দেভু বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকে সকলে। দেভু তাঁহার নোটিফিকেশন চেক করিয়া নতুন স্ট্যাটাস দিলো - " Dhaka , my sweet Dhaka স্ট্যাটাস দিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করিয়া জানালার ধারে গিয়া দাড়াইলো। 

তাঁহাদের সামনের বাড়িটাই পারুদের। দেখিলো পারুদের বাড়ি আগের মতই রহিয়াছে। আগের মতই টিনশেড বাড়ি। বরং আরো রুগ্ন হইয়াছে। দুই পাশ দিয়া বহুতল ভবন যেন চাপিয়া ধরিয়াছে। সূর্যালোক আসিবার সকল পথ যেন রুদ্ধ। পারুদের বাড়ি দেখিয়া দেভুর পুরানো প্রেম আবার জাগিয়া উঠিলো। পারুর সহিত দেখা করিবার জন্য আকুলি বিকুলি করিতে লাগিলো। সন্ধ্যা হইতেই দেভু নতুন সিম তুলিয়া তাঁহার দেশী মোবাইল নম্বর চালু করিলো। কিন্তু ফোন করিয়া কাহার সহিত কথা বলিবে , ভাবিয়া পাইলো না। কোনমতে সেদিন পার করিলো দেভু। পরদিন সকালে উঠিয়া নাস্তা করিয়া গুটি গুটি পায়ে পারুদের বাড়িতে গমন করিলো দেভু। বাড়িতে ঢুকা মাত্রই পারুর মাতার সহিত সাক্ষাৎ হইলো। - ওমা , দেবু দেখি। কত বড় হয়ে গেছে !!! পারুর মা কপট আন্তরিকতা দেখাইয়া কহিলো। - আদাব মাসিমা। কেমন আছেন আপনারা , দেখতে এলাম । দেভুর জবাব। দেভু কে তাহাদের বসার ঘরে নিয়া বসাইলো। ভালো মন্দ আলাপচারিতার চলিবার ফাঁকে দেভু জানিলো , পারু এখন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এম বি এ করিতেছে। এখনও অবিবাহিত পারু। পারুর মাতা কথায় কথায় এও বুঝাইলো , দেভুর সহির পারুর বিবাহতে তাহাদের আপত্তি নাই। 

আলাপচারিতা শেষ করিয়া পারুর মাতাকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়া বাসায় ফিরিলো দেভু। বাসায় ফিরিয়া দেভু আবার ফেসবুক নিয়া ব্যস্ত হইয়া পড়িলো। তাঁহার বিলাতি বান্ধবীদের সঙ্গ না পাইয়া দেভুর অতি কষ্টে দিন কাটিলো। শুধু ফেসবুকে তাহাদের ছবি দেখিয়া কি মন ভরে !!! সন্ধ্যা বেলায় একটি অপরিচিত নম্বর হইলে দেভুর মোবাইলে একটা কল আসিলো। তাহাকে কে ফোন করিতে পারে ? ভাবিতে ভাবিতে দেভু কল রিসিভ করিলো - - কেমন আছো ? মোবাইলের ওপাশ থেকে মিষ্টি একটা কন্ঠ। - কে ? দেভু কহিলো - চিনতে পারলে না ? আমাকে ভুলেই গেলে একেবারে। - না স্যরি চিনতে পারি নাই। মিষ্টি কন্ঠের এরকম ন্যাকামো শুনিয়া দেভু বিরক্ত হইলো। বিরক্ত চাপিয়া কহিলো - কে বলছিলেন ? আপনাকে আমি চিনবো কি করে ? মাত্র দেশে এলাম। - পারু। তোমার পারু। ওপাশ থেকে শব্দ এলো। 

 ৩ 

পারু , তোমার পারু ,ওপাশ থেকে শব্দ এলো। অনেকটা ফিসফিসিয়ে যেন কহিলো পারু। - পারুউউউউউ বলিয়া একটা হালকা চিৎকার করিলো দেভু।
 তবে পারুর কন্ঠ শুনিয়া তাহার ভিতরে কোন ঝড় বহিলো না, বজ্রপাত হইলো না, সুনামি আঘাত করিলো না, জমিন ফাটিয়া চৌচিরও হইলো না। শুধু বিলাতি টোনে ইংরেজী তো কহিলো - dude... whazz up ? how is going on? um so glad ...... " ইত্যাদি ইত্যাদি। 
 দেভুর কন্ঠে এরুপ ইংরেজী শুনিয়া পারু স্তম্ভিত হইয়া রহিলো, কথার খেই হারাইয়া ফেলিয়া মিন মিন করে কহিলো - i m pine , u ? 
 পারুর কথা শুনিয়া দেভু দীর্ঘশ্বাস গোপন করিয়া কহিলো - কেমন ছিলে এতদিন? তোমাকে কত যে খুঁজেছি, তুমি জানোনা। 
-আমাকে কোথায় খুঁজেছ ? আমার কথা কি কখনও মনে পড়তো তোমার বিলাত গিয়া? 
- পারু ফেসবুকে তোমাকে খুঁজেছি কত। পাইনি। পার্বতী দিয়া সার্চ করতে করতে আমার আঙ্গুল ব্যাথা হয়ে গেছে, আমি পাইনি। আর তোমার কথা আমার প্রতিদিন একবার হলেও অন্ততঃ মনে পড়তো ।
 - ফেসবুকে কি করে পাবে, পাবলিক সার্চ বন্ধ করে রেখেছি যে, আর তোমার আই ডী দাও, আমিই তোমাকে এড কড়িয়া নিবো। 
প্রতিদিন মাত্র একবার মনে করতে আমাকে? পারু আহ্লাদ করিয়া কহিলো। 
- তুমি আমাকে কেন এতদিনে এড করোনাই পারু ? কপট রাগ দেখাইয়া কহিলো দেভু। 
আর তোমাকে মনে পড়িতো .............. " কহিতে গিয়া কহিলো না, চিন্তা করিয়া কখন মনে পড়িতো কহিতে হইবে। 
পারুর কথা তো বেমালুম ভুলিয়াই গিয়াছিল। 
 - ইশশ, মেয়েরা বুঝি ছেলেদের এড রিকোয়েস্ট পাঠায় ? বুদ্ধু কোথাকার। এই, বলো না, কখন আমার কথা মনে পড়িতো ? 
 দেভু কথা ঘুরাইয়া লইলো। পারুর ফেসবুক আইডি চাহিয়া লইলো। 
ফোনে আলাপরত অবস্থাতেই সে পারু কে এড রিকোয়েস্ট পাঠাইলো। আরো খানিক ক্ষন তাহার ফোনে খুনসুটি আলাপ করিয়া অতঃপর ফোন রাখিলো। 
 তাহাদের মধ্যে কথা হইলো রাত্রি ১২ টার পর তাহার আবার ফোনে আলাপ করিবে। দেভু ফেসবুক ওপেন করিয়া বসিয়া রহিলো পারুকে দেখিবে বলিয়া। পারুর প্রোফাইল পিকে দেখিলো ঐশ্বরিয়া রাই এর ছবি। এই ছবি দেখিয়া দেভু ভাবিলো, ফ্রেন্ড হইলে নির্ঘাৎ তাহার ছবি দেখিতে পাইবে। ভিতরে কোথাও লুকাইয়া রাখিয়াছে তাহার ছবি। পারু তাহা হইলে অসম্ভব রূপবতী হইয়াছে, যে কারণে তাহার ছবি লুকাইয়া রাখিতে হয়। ভাবিতে ভাবিতেই নোটিফিকেশন আসিলো " Paaru Parvati accepted your friend request" দেভু উৎফুল্ল হইয়া উঠিলো, তাহার ভিতর এক রকমের বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলিয়া গেল। 

এতদিন পর পারু কে দেখিবে। দেভু ধীরে ধীরে পারুর প্রোফাইলে গমন করিলো। তাহার ছবির এলবাম গুলি খুলিলো। যত ছবি ছিলো সব খুলিয়া দেখিলো। সে দেখিতে পাইলো তাহার আলবাম জুড়িয়া শুধু দেশী আর ভারতীয় নায়িকাদের ছবি দিয়া ঠাসা। তাহার নিজের কোন ছবি নেই। আর দেখিলো ওয়াল ফটো তে ছাকিব খান নামক এক দেশী নায়কের ছবি দেয়া, সেখানে ক্যাপশনে লিখা - ম্যারি মি। এসব দেখিয়া দেভু যাহারপর নাই হতাশ হইয়া আবার নখ কামড়াইতে লাগিলো। ভগ্ন মনোরথে সে পারুর স্ট্যাটাস দেখিতে লাগিলো। 

দেখিলো পারু কিছু না লেখিয়া ................ চিহ্ন প্রদান করিলেও তাহাতে শতক খানি লাইক পায়, অর্ধশত কমেন্টও পাইয়া থাকে। দেভু বুঝিলো লুল দেশে দেশে যুগে যুগে রহিয়াছে একই ভাবে। 

 তাহাদের পূর্বের কথা মতন রাত্র ১২ ঘটিকায় আবার তাহার মোবাইল ফোনালাপ শুরু করিলো। দেভু জানাইলো , পারুর কোন ছবি দেখিতে না পাইয়া সে বড়ই কষ্ট পাইয়াছে। খুব আশা করিয়া তাহার ছবি দেখিতে গিয়াছিলো। পারু জবাবে কহিলো - "এত ব্যস্ত হবার কি আছে। সময় আসুক দেখবে। পারু তো পালিয়ে যাচ্ছে না। এতদিন অপেক্ষা করলে, আর কয়টা দিন করতে সমস্যা কি, মিস্টার?" পারুর জবাবে খুশী হইলো না দেভু। বিদেশ থাকিয়া তাহার খাছলত খারাপ হইয়া গিয়াছে । সেখানে এত অপেক্ষা করিবার সময় কাহারো নাই। ধর মার কাট গতিতে তাহারা ডেটিং এ যাইয়া থাকে। ভাবিয়াছিলো পারুর সহিত একই নিয়ম খাটাইবে। দেশে আসিয়া তো এখনো কাহারো সাথে সুবিধা করিয়া উঠিতে পারে নাই।

 তবু পারুর মন রক্ষার্থে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিলো - "তুমি বুঝিবে কি এই অপেক্ষার কষ্ট" । গভীর রাত অবধি তাহাদের আলাপ চলিলো। আলাপ সারিয়া দেভু ভাবিয়া দেখিলো বাস্তবিক সে পারুর কন্ঠ এই প্রথম শুনিলো। তাহার কন্ঠ শুনিয়া দেভু মুগ্ধ হইয়া পারুকে কল্পনা করিতে করিতে ঘুমাইয়া গেল। কন্ঠ যাহার এত সুন্দর , না জানি সে কত সুন্দর হইবে ভাবিয়া পুলকিত হইলো সে। কেহ জানিলো না সে রাতে উঠিয়া দেভুর কাপড় পাল্টাইতে হইলো। 

 ৪ 

 এদিকে নারায়ণ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী কৌশল্যা অর্থাৎ দেভুর পিতা মাতা বড়ই অস্থির হইতে লাগিলেন। দেভু বিলাত হইতে আসিয়া ঘরের বাহির হয়না, চাকুরির সন্ধান করেনা। সারাক্ষন তাহার ল্যাপটপ খানি খুলিয়া কি যেন কি করিতে থাকে। অপরদিকে পারুর মাতা সুমিত্রাও ইদানিং এই বাড়িতে যাতায়ত বাড়াইয়া দিয়াছে। পূর্বে দেখা যাইতো সকাল দুপুর কি রাত, সুমিত্রা পারু কে কয়েকখানা কাচা লঙ্কা কিংবা একটু চিনি কিংবা ঘি চাহিতে পাঠাইতো, সেই সুমিত্রা নানা ব্যাঞ্জন সাজাইয়া আসিতে শুরু করিয়াছে। তাহার এরুপ ব্যঞ্জনা সাজাইয়া আনা কৌশল্যা স্বাভাবিক ভাবে লইতে পারিতেছে না। 

 দেভু তাহার কক্ষে বসিয়া ফেসবুক হাতড়াইতেছিল। পারুর বন্ধু তালিকায় থাকা প্রায় সকলকেই ইতঃমধ্যে দেভু তাহার বন্ধু তালিকায় যোগ করিয়া লইয়াছে। ইহাদের কাহারো সহিত তাহার ফোনালাপও হইয়া গিয়াছে এরই মধ্যে। দেভু ফেসবুক হাতড়াইতেছিল , এমন সময় তাহার ফোন বাজিয়া উঠিলো। দেখিতে পাইলো পারু "মিসড কল" দিয়াছে। দেভু এই কয়দিনেই খেয়াল করিয়া দেখিলো, এদেশের নারীরা সর্বদা মিসড কল প্রদান করে। তাহাদের কে পুনরায় কল করিতে হয়, কথা কহিবার জন্যে। দেভু ঠিক করিলো, আজ পারুকে বলিতেই হইবে সে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে ব্যাকুল হইয়া রহিয়াছে।

 এমন সময় বাসার গৃহ পরিচারিকা আসিয়া খবর দিলো যে দেভুর পিতা তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছে। - বাবা ডেকেছেন? পিতার কক্ষে প্রবেশ করিতে করিতে দেভু জিজ্ঞাসা করিলো। নারায়ণ মুখোপাধ্যায় বিছানায় বসিয়া "দৈনিক তাহাদের সময়" পড়িতেছিল, ইহাই বর্তমানে সবচাইতে সস্তা পত্রিকা। - হুম বস 


নারায়ণ মুখোপাধ্যায় কহিলেন। দেভু চুপ করিয়া খাটের এক ধারে গিয়া বসিলো। ছোটবেলা হইতেই সে তাহার পিতাকে চরম ভয় পায়। অদ্যবধি সেই ভয় কাটে নাই তাহার। সে ভয়ে কাটাইতে নিজের নখ কামড়াইতে লাগিলো। পত্রিকা পড়া শেষ হইলে নারায়ণ বাবু কহিলেন - - বিলাত থেকে আসার পর সারাদিন যে ঘরেই বসে থাকো কারণ টা কি ? চাকরী বাকরি কি কিছু খুঁজতেছো ? - জ্বী বাবা, মানে অনলাইনে ........ দেভু তোতলাইতে তোতলাইতে কহিতে আরম্ভ করিলো , এমন সময় তাহার মোবাইল বাজিয়া উঠিলো। এইবার তাহা মিসড কলেইর ন্যায় একবার বাজিয়াই থামিলো না। তাহা বাজিতেই লাগিলো। দেভু দেখিলো পারু পুনরায় ফোন করিয়াছে। 

 নারায়ণ বাবু পুত্রের কথা মন দিয়ে শুনিতেছিলেন , তাহার মধ্যে হঠাৎ করিয়া অশ্লীল শব্দ দ্বারা নির্মিত রিংটোন শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলেন। - যাও আগে কথা বলে আসো। বেদ্দপ পোলাপান। দেভু দ্রুত পিতার ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। নিজের কক্ষে পৌছাইয়া যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। তাহারপর পারু কে ফোন করিলো। - উফ। এমন সময়ে ফোন করেছ, আমি বাবার সাথে কথা বলতেছিলাম। দেভু কহিলো - ওহ। বুঝি নাই। তোমাকে খুব মিস করতেছিলাম তাই কল দিলাম। 

পারুর উত্তর - মিস না ছাই। আজ কয়দিন ধরে দেখা করার জন্য বলতেছি, তোমার সময়ই হয় না। আবার বলো মিস করতেছিলে। - আরে দেখা তো হবেই। সত্যই কি দেখা করতে চাও? আগে বলো তুমি কি আমাকে আগের মতই পছন্দ করো ? দেখা করে পরে যদি পছন্দ না করো, সেই ভয়েই দেখা করিনা দেভু। তুমি জানোনা, আমি তোমাকে সেই আগের মতই ভালোবাসি। 

 পারুর এমন নাটকীয় কথা শুনিয়া দেভুর মাথার তার ছিড়িয়া যাইবার উপক্রম। ইহার মধ্যে পিতার সম্মুখে বেইজ্জতি হইয়াছে রিংটোনের কল্যাণে। অনেকটা চিৎকার করিয়াই দেভু কহিলো - পারু। প্লিজ স্টপ ইট। আমি কালকেই তোমার সাথে দেখা করতে চাই। কালকে কোথায় , কখন দেখা করবা আমারে জানাও। আমি কোন না শুনতে চাইনা। কালকেই যদি দেখা করতে না পারো, আর কোনদিন দেখা হবে না বা কথা হবে না। এই আমার শেষ কথা বলে দিলাম। 

 পারু ফোন রাখিয়া কিছুক্ষন চুপ করিয়া বসিয়া রহিলো। তারপর ঠান্ডা মস্তিষ্কে ভাবিলো , যাহা হইবার হইবে। কপালে যাহা আছে, তাহাই হইবে। কালকেই সে সাক্ষাৎ করিবে দেভুর সহিত। অতঃপর সে সময় ও স্থান উল্লেখ করিয়া দেভুর মোবাইলে টেক্সট পাঠাইয়া দিলো। 

 প্রত্যুতরে দেভু ঠিক আছে লিখিয়া চুম্বন ও হৃদয়ের ইমো প্রদান করিয়া পারুকে টেক্সট পাঠাইয়া দিয়া পারুর কোন এক বান্ধবির সহিত চ্যাটে মশগুল হইয়া গেল। 

 পরদিন বিকাল ৫ ঘটিকা। দেভু এক গুচ্ছ গোলাপ রইয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে রমনা পার্কে, বকুল তলে। পারু সেখানেই তাহাকে দাঁড়াইতে বলিয়াছিলো। পারু দেখিতে কেমন হইয়াছে, তাহাকে দেখিলে সে কি করিবে, পারুই বা কি করিবে , সেই মুহুর্ত কেমন হইবে নানাবিধ চিন্তা করিতে লাগিলো। 

দূরে বেঞ্চিতে বেঞ্চিতে কপোত কপোতি জোড়ায় জোড়ায় বসিয়া রহিয়াছে, তাহারাও কি সেরুপ কোথাও গিয়া বসিবে নাকি কোন রেস্টুরেন্টে বসিবে - এইরুপ নানান চিন্তা করিতে করিতে দেখিলো একজন মহিলা তাহার দিকে আসিতেছে। দেভু খেয়াল করিয়া দেখিলো একটি হস্তিনী শাবক এর ন্যায় একজন তাহার দিকেই আসিতেছে। তাহার শরীরের প্রস্থে হিসাবে কাপড় বানাইতে হইলে মশারী কাটিয়া কাপড় বানাইতে হইবে। তাহার আগমন খেয়াল করিয়া দেখিতে লাগিলো এবং ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতে লাগিলো , এ যেনো অন্য দিকে ফিরিয়া যায়। ঈশ্বর তাহার প্রার্থনা শুনিবার আগেই সে নারী আসিয়া দাঁড়াইলো দেভুর সম্মুখে। একখানা বিগলিত হাসি ছুড়িয়া দিলো । 

দেভু চেহারার দিকে তাকাইয়া দেখিলো এ যেন সাক্ষাৎ মন্ত্রী তাহেরা খাতুন। তাহার কথা শুনিবার আগেই দেভু মুর্ছা গেল। সোজা হইয়া পড়িয়া গেল রমনা উদ্যানের মাটিতে। 

৫ 

রমনা উদ্যানের ভিতর দিয়া লাল মিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহার কিছু কাজ ছিলো , তাহা সমাপ্ত করিয়া একটু রিফ্রেশ হইবার জন্য উদ্যানের ভিতর দিয়া যাইতেছিলেন এক পানশালায়। লাল মিয়া চুনের ব্যবসা করিয়া বিস্তর টাকা কামাই করিয়াছেন বলিয়া তাহাকে সকলে চুনালাল বলিয়া ডাকিত। তাহা বিকৃত হইয়া এখন চুনিলাল হইয়াছে। সেই চুনিলাল উদ্যানের মাটিতে একজন কে দাত মুখ খিচিয়া পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া দাঁড়াইলো। একজন অজ্ঞান হইয়া মাটিতে পড়িয়া আছে , তাহাকে ঘিরিয়া কয়েকজন উৎসুক ব্যাক্তি দাঁড়াইয়া দেখিতেছে , কিন্তু কেহই তাহাকে সাহায্য করিতে আগাইয়া যাইতেছে না।

সে অবস্থায় চুনিলাল সেখানে গিয়া উপস্থিত হইলেন । এক বোতল পানি কিনিয়া লইয়া অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে ছিটাইলেন । মাথায় ছিটাইলেন। তাঁহার তৎপরতায় সেই ব্যক্তি টি জ্ঞান ফিরিয়া পাইলো। সে দেখিলো তাঁহার সম্মুখে একজন বোতল হাতে বসিয়া, আর কয়েকজন তাহাকে ঘিরিয়া কৌতূহল দৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিয়াছে। 
সে কহিলো - আমি কে ? আমি এখানে কেন ? চুনিলাল দেখিলো কেস খারাপ। 
এরকম সব ভুালিয় যাওয়া ব্যক্তিকে লইয়া কি করিবেন , ভাবিয়া বড়ই অস্থির হইয়া উঠিলেন। উপায়ন্তর না দেখিয়া তাঁহার মাথায় বিশাল এক চাটি মারিলেন। 
চাটি খাইয়া সেই ব্যক্তির মাথা ঘুরিয়া উঠিলো। মাথা ধরিয়া, চক্ষু মুদিয়া বসিয়া রহিলো কিছুক্ষন। মিনিট পাঁচেক পর চুনিলাল দেখিলো সে তাঁহার মাথা হইতে হাত নামাইয়া লহিয়াছে। তাহারপর একটু একটু করিয়া চক্ষু দুইটা খুলিলো। 

চুনিলালের দিকে তাকাইয়া কহিলো - আমি দেভু। অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। আপনি ? - আমি চুনালাল ওরফে চুনিলাল। 
এইখানে অজ্ঞান হলেন কিভাবে ভাই ?
 - সে এক বিরাট ইতিহাস ভাই। এখানে বলতে পারবো না । চলেন কোথাও গিয়ে বসি। 
- কোথায় বসবেন, তাঁর চেয়ে বাসায় চলে যান। অসুস্থ মানুষ। 
 বাসার কথা বলিতেই দেভুর বাসা, পারু দের বাসা, পারুর কথা মনে পড়িলো। পারুর চেহারা ভাসিয়া উঠিতেই দেভু হাউ মাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিলো। 
তাঁহার কান্না দেখিয়া অপ্রস্তুত চুনিলাল তাহাকে "কাঁদে না বাবু, কাঁদে না" বলিয়া সান্ত্বনা দিতে লাগিলো।

 কান্না শেষ হইলে দেভু উঠিয়া দাঁড়াইলো। চুনিলালও তাঁহার সহিত দাঁড়াইলো। আশেপাশে লোকজন তখন ফিরিয়া যাইতে শুরু করিলো একে একে। 
- কোথায় বসবেন ভাই ? চুনিলাল শুধাইলো। 
- আপত্তি না থাকলে চলেন শাকুরা তে গিয়া বসি। । 

শাকুরার নাম শুনিয়া চুনিলালের চৌক্ষে খুশীর ঝিলিক খেলিয়া গেল। সে শাকুরার উদ্দেশ্যেই আসলে যাইতেছিল। শাকুরা তে গিয়া একটি টেবিল দেখিয়া দুই জনের জন্য শক্ত পানীয়র আদেশ দিয়া দেভু তাঁহার কাহিনী বর্ননা করিতে লাগিলো। তাঁহার পাকস্থলী অল্প অল্প করিয়া পানীয় যাইতেছে আর সে এক এক করিয়া তাঁহার কাহিনী বের করিতেছে। 

চুনিলাল সব শুনিয়া কহিলো - আরে বন্ধু এত ভাবনা কিসের !!! ম্যায় হু না। চলো , তোমাকে তাহলে এক জায়গায় নিয়ে যাই। সব হুর পরিদের জায়গা। যাবা ? হুর পরিদের কথা শুনিয়া দেভুর চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠিলো । কহিলো - চলো বন্ধু, চলো। বিপদে বন্ধুর পরিচয়। একটি ক্যাব ভাড়া করিয়া চুনিলাল তাহাকে লইয়া গুলশানে গমন করিলো। 

দেভু কে লইয়া চুনিলাল এক সুরম্য প্রাসাদে তাঁহার প্রবেশ করিলো । সেখানে প্রতি রাতে ডিজে পার্টি হইয়া থাকে। তাঁহারা মদপান করিতে করিতে গানের তালে তালে নাচিতে নাচিতে হাঁপাইয়া গেলে অতঃপর জোড়ায় জোড়ায় সেই প্রাসাদের কোন কক্ষে ঢুকিয়া রিফ্রেশ হইয়া আসে। সেথায় মদ্যপান তো নস্যি, হেন কোন পান নাই যে তাহারা করে না। দেভু নৃত্যরত বালিকাদের স্বাস্থ্যের মাপ দেখিয়া খুশীতে নাচিয়া উঠিলো। মনে মনে কহিলো - এইতো আমি চাই। নাচের দলের মধ্যে দেভু মিশিয়া গেল। 

৬ 
দেভু নাচিতে নাচিতে সকলের সঙ্গে মিশিয়া গেল । শব্দ বাক্সে গান বাজিতেছে। হিন্দি গান চলিতেছে সেথায়। গানের কথা এইরূপ - একজনের নাম শীলা, সে তাহার যৌবন নিয়ে খুবই উৎফুল্ল। তাহার যৌবন ভিত্তিক গানের সহিত একদল ছেলে মেয়ে উদ্দাম নৃত্য করিতেছে সেই বিশাল বাড়ীতে। দেভু কতক্ষন ধরিয়া নাচিলো , হুঁশ করিতে পারিলো না। 

নাচিতে নাচিতে একসময় তাহার তেষ্টা পাইলো। নাচ থামাইয়া এদিক ওদিক করিতে করিতে নাচের আসর হইতে চুপিসারে বাহির হইয়া জল খোঁজ করিতে লাগিলো । একজন কে শুধাইয়া সে সেখানের জলপানের স্থানে পৌছাইলো। এক বোতল শীতল মিনারেল ওয়াটার লইয়া গলায় ঢালিতেই দেখিলো চুনিলাল আসিয়া হাজির। তাহার সহিত এক আকর্ষনীয় তন্বী । 

চুনিলাল কহিলোঃ - কি হে , খুব মৌজ করলা দেখলাম। নাচতে নাচতে ঘামায় গ্যাছো মামু। 
- এই আর কি। মজা লাগলো। দেশে আইসা ঘরে বসে থেকে থেকে হাত পা এ গিট ধরে গেছিলো। তাই ছুটাইলাম। 
- ভালো ভালো। গিট ছুটছে তাইলে ? পরিচিত হও - এ হইলো চন্দ্রা। 
এই কহিয়া চুনিলাল সেই তন্বী টির দিক তাকাইলো। দেভুও তখন ভালো করিয়া তাকাইলো। 

তাহার আঁখি পল্লব, তাহার ভ্রূ যুগল, নাসিক্র গঠন, গোলাপের ন্যায় তাহার ওষ্ঠ দুখানি, তাহার সরু হয়ে আসা চিবুক - হিন্দি নায়িকাসম শারীরিক গঠন - তাহার আঁটসাঁট পোশাক , গামছার ন্যায় এক কোনে ঝুলন্ত ওড়না- সব কিছু দেখিয়া দেভুর মাথা হইতে পা পর্যন্ত একখানা তড়িৎ বেগ খেলিয়া গেল। তাহার শরীর ঝাঁকাইয়া উঠিলো। হাত পা সিরসির করিতে লাগিলো। হৃদস্পন্দন বাড়িয়া গেল। চোয়াল ঝুলিয়া পড়িয়া নিচের পাঁটির দাত আরো নিচে নামিয়া গেল। 

- হাই। আম চন্দ্রা । মেয়েটি হাত বাড়াইয়া দিলো দেভুর দিকে। 
দেভু রোবটের ন্যায় হাত বাড়াইয়া কহিলো - আম দেভু। হ্যান্ডশেক করিয়া সে হাতখানি সরাইতে ভুলিয়া গেল। 

চন্দ্রা উসখুস করিতে লাগিলে দেভু সম্বিত ফিরিয়া পাইলো। দ্রুত তাহার হস্তখানি সরাইয়া লইয়া আসিলো। চলো , কোথাও গিয়ে বসি - দেভু প্রস্তাব করিলো। 
সাথে সাথেই চুনিলালা কহিলো - ওকে , তোমরা গল্প করো, আমি গেলাম। বাসায় যেতে হবে। 
চন্দ্রা ও দেভুর কাছ হইতে বিদায় লইয়া চুনিলাল প্রস্থান করিলো। 
ওদিকে চন্দ্রা দেভু কে লইয়া একখানা বসার ঘরে গিয়া বসিলো। নরম সোফায় গা এলিয়ে দিতেই চন্দ্রা কহিলো - 
- এই , তুমি ড্রিঙ্কস করোনা ? 
- হুম করি। 
- ড্রিঙ্কস অর্ডার করো। ড্রিঙ্কস করতে করতে কথা বলি। 
- কোথায় ড্রিঙ্কস অর্ডার করবো ? 
চন্দ্রা হাসিয়া একটা কলিং বেল এর সুইচ চাপিলো। কিছুক্ষন পর একজন বেয়ারা আসিয়া উপস্থিত হইলো। 
 চন্দ্রাঃ আমাদের ড্রিঙ্কস সার্ভ করো । আমার জন্য টাকিলা। আর সাহেবের জন্য - 
- আমার জন্য যিন। দেভু কহিলো। 
 তাহাদের ফরমায়েশ লইয়া বেয়ারা ফিরিয়া গেল। 
 - জানো , আমার মুখ টা নাকি চাঁদের মতন বলে সবাই আমাকে চন্দ্রমুখী বলে ডাকে। কি ক্ষ্যাত নাম! উফফ। আমার ভালো লাগে না। 
- আমি তোমাকে কি চন্দ্রমুখী বলেই ডাকবো? 
- ভালো হবেনা কিন্তু বলে দিচ্ছি। কপট রাগ দেখাইয়া চন্দ্রা কহিলো। 
- অয়েল চন্দ্রা বলেই ডাকবো তাহলে। 
তাহাদের কথপোকতন এর ভিতরেই বেয়ারা সার্ভ করিয়া গেল ফরমায়েশ মোতাবেক। 
ড্রিঙ্কসে চুমুক দিতে দিতে তাহাদের কথা আগাইয়া চলিলো। দেভুর হৃদস্পন্দন বাড়িতে লাগিলো। সেদিনের মত কথা বলিয়া, মাঝরাতে বাড়ি ফিরিলো দেভু। তাহার চক্ষু জুড়িয়া শুধুই চন্দ্রা । তাহার হাসি, তাহার মুক্তার মতন দাঁত, তাহার দুষ্টুমি, সব ভাবিতে ভাবিতে দেভু ঘুমাইয়া পড়িলো। পরদিন বেলা ১২ টার সময় তাহার মাতার চিৎকারে ঘুম ভাঙিলো দেভুর। তাহার এমন রাত করিয়া বাড়ি ফেরা, এমন বেলা করিয়া ঘুমানো দেখিয়া চিৎকার করিয়া পুরো ফ্ল্যাট মাথায় তুলিয়া লইয়াছেন। দেভু বিরক্তি লইয়া বিছানা হইতে নামিলো। কাহারো সহিত কোন কথা কহিলো না। কে বুঝিবে তাহার কষ্ট !!! পারু তাহাকে এরূপ ডাম্প করিবে, জানিলে !!! 

দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বাথরুমে প্রবেশ করিলো দেভু। ফ্রেশ হইয়া, আহারাদি করিয়া ভাবিলো চন্দ্রা কে একখানা কল করিবে। মোবাইল সেট খানা হাতে লইয়া চন্দ্রার নাম্বার চাপিলো। দেখিলো তাহার নাম্বার খানা ব্যাস্ত রহিয়াছে। দেভু প্রায় ৪০ মিনিট ধরিয়া ক্রমাগত চাপিতে চাপিতে অবশেষে তাহার নাম্বার ফ্রি পাইলো। - কতক্ষন ধরে তোমার নাম্বারে ট্রাই করতেছি। এতক্ষন বিজি !!! দেভুর কন্ঠে উষ্মা। 

- আর বলোনা। বড় ভাইয়া ফোন করেছিল। ঢাকার বাইরে থাকেতো। এই সেই কত কথা। বাদ দাও সুইট হার্ট। তোমার কথা বল । কি অবস্থা ? 

 চন্দ্রার আদুরে কন্ঠে এমন কথা শুনিয়া দেভুর সকল রাগ, ক্লান্তি উড়িয়া গেল। 
- তোমারেই ভাবতেছিলাম আসার পর থেকে। 
- সত্যিই ? আমাকে মিস করো তুমি ? 
- সত্যিই তোমাকে মিস করতেছি অনেক। 
- মিস না ছাই। সকাল থেকে একটাও কল দিলানা তুমি। 
- অপস সুইট হার্ট , আমি ঘুম থেকে মাত্র উঠলাম। রাগ করে না।
- ওকে মিস্টার। রাগ করলাম না। তো আজকের প্ল্যান কি ? 

 এরূপ তাহাদের কথা বার্তা চলিলো কিছুক্ষন। শেষ পর্যন্ত তাহারা আজিকে বাহিরে কোথাও দেখা করিবে বলিয়া ঠিক করিলো। তাহারা আজ একত্রে "ডিনার" করিবে, এরূপ সিদ্ধান্ত লইয়া ফোন রাখিলো। দেভু শেভ করিয়া , স্নান করিয়া , সুগন্ধি মাখিয়া তাহার প্যান্ট বাহির করিয়া, অনেকগুলা টি শার্ট হইতে বাছিয়া একখানা টি শার্ট গলাইয়া যথেষ্ট পরিমান টাকা পয়সা লইয়া বাহির হইলো। দেশে আজ তাহার প্রথম ডেটিং। 

 কথামতন নির্ধারিত স্থানে চন্দ্রা আসিলো ৬০ মিনিট পর। ফুটপাতের উপর দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলো দেভু। তাহার পা ব্যাথা করতে লাগিলো এক সময়। অতঃপর চন্দ্রা আসিয়া হাজির হইলো। রাস্তার জ্যাম এর কারণে তাহার আসিতে দেরী হইয়াছে বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিলো। দেভুকে কষ্ট প্রদান করিয়াছে বলিয়া সেই কষ্ট পাইলো। দেভু তাহার সকল কষ্ট ভুলিয়া গেল নিমিষেই। তাহারা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে একখানা শপিং মল এ ঢুকিলো। থরে থরে বিদেশী পণ্য দিয়ে সাজানো। দামী দামী ব্রান্ডের পণ্য সকল। চন্দ্রা এটা দেখে , ওটা ধরে। দেভুর দিকে তাকায়। 

দেভু তাহার চোখের ভাষা বুঝিলো। বলিলো - - যেটা পছন্দ হয় - নাও। যা পছন্দ হয় নাও। - ইউ আর ছো ছুইট। চন্দ্রা বিগলিত হাসি দিয়া কহিলো। অতঃপর একগাদা শপিং করিয়া তাহারা বাহির হইলো ডিনারের উদ্দেশ্যে। দেভু এই ফাঁকে তাহার মানিব্যাগের ভিতরের অর্থকড়ির হিসাব করিতে লাগিলো। তাহারা ডিনার সারিলো। দেভু ভাবিয়াছিলো খুব বেশী আইটেম লইবে না ডিনারে। তাহারা অল্প আইটেম লইয়াছিলো কিন্তু চন্দ্রার কারণে অনেক গুলা আইটেম লইতে হইলো। ডিনার করিতে করিতে চন্দ্রা জানাইলো সে তাহার কাজিনের জন্য কিছু খাদ্য দ্রব্য প্যাকেট করিয়া লইয়া যাইতে চায়। দেভু প্রমাদ গুনিলো। 

হাসিমুখে জানাইলো - সিওর সিওর। তখনই চন্দ্রা বেয়ারা কে ডাকিয়া বিশাল এক তালিকা ধরাইয়া দিলো প্যাকেট করিয়া দিতে। বাসায় লইয়া যাইবে তাহার কাজিনের জন্য। অতঃপর বিল আসিলো। অল্পের জন্য দেভু হার্ট এটাক হইতে রক্ষা পাইলো। তাহার শরীর ঘামাইয়া উঠিলো। মানিব্যাগ হইতে টাকা বাহির করিয়া দেখিল - নাহ, যাহা আছে তাহা দিয়া বিল প্রদান করা সম্ভব। সমস্ত টাকা দিয়া বিল প্রদান করিয়া তাহারা দুইজন বাহির হইলো। চন্দ্রা খাবার এর প্যাকেট , শপিং এর প্যাকেট লইয়া একখানা সি এন জি ডাকিয়া , বিদায় লইয়া প্রস্থান করিলো। যাইবার পূর্বে দেভুর এতগুলা টাকা খরচ করিয়া দেবার জন্য আফসোস করিলো। দেভু হাসিমুখে তাহা উড়াইয়া দিল। কহিলো - এটা কোন ব্যাপারই না। সামনে আরো এরকম শপিং এ যাইতেও সে প্রস্তুত। চন্দ্রাকে বিদায় জানাইয়া দেভু হাঁটিতে লাগিলো। তাহার মানিব্যাগে মাত্র ২ টাকা পড়িয়া আছে। সমস্ত টাকাই খরচ হইয়া গিয়েছে। গুলশান হইতে হাঁটিয়া জিগাতলা যাইতে হইবে। এ ছাড়া তাহার আর কোন পথ নাই। দেভু হাঁটা আরম্ভ করিলো। তাহার সঞ্চয়কৃত পাউন্ড গুলি আগামীকালই ভাঙাইতে হইবে । এই ভাবিতে ভাবিতে সে হাঁটিতে লাগিলো। 

 ৭ 

দেভু আর চন্দ্রার প্রেমের ঝড়ে আকাশ পাতাল উথাল-পাতাল হইতে লাগিলো, মর্ত্যের শুষ্ক বালু উড়িয়া ঘরবাড়ি তলাইয়া গেল। সেই বালুতে মুখ গুঁজিয়া সকলে যেন উটপাখির ন্যায় জীবন যাপন করিতে লাগিলো। তাহা দেখিয়া কোন কোন পত্রিকা উটপাখি নয়, মানুষের জীবন চাই শ্লোগান নিয়া আগাইয়া আসিলো। তাহাতেও তাহাদের প্রেমের জোয়ার কমিলো না। দেভু আর চন্দ্রা প্রত্যহ সাক্ষাৎ করিতে লাগিলো , চন্দ্রার শপিং জোর কদমে চলিতে লাগিলো , কখনো বা তাঁহার জন্য কখনো বা তাঁহার কাজিনের জন্য কিংবা সাথে আসা কোন বান্ধবীর জন্যে। প্রতিবারই তাহারা শপিং এর পর বাহিরে খাইতে লাগিলো। কখনো বা তাহারা দুই জন কখনো চন্দ্রার কয়েকজন বান্ধবী সহ তাহারা বাহিরে খাইতে লাগিলো। পাশা পাশি তাঁহাদের ডি-জে পার্টিও সমানতালে আগাইতেছিলো । 

 অপরদিকে দেভুর সঞ্চয়কৃত পাউন্ড কমিতে কমিতে তলানিতে আসিয়া ঠেকিলো। একদিন সকালে দেভু তাঁহার মানিব্যাগ ঘাটিতে ঘাটিতে ভাবিল, এরূপ চলিতে লাগিলে সামনের দিনগুলিতে তাহাকে পাড়ার মোড়ের ভাই ভাই হোটেল এন্ড রস্টুরেন্টে চন্দ্রা কে নিয়া বসিয়া আলু পুরি আর চা খাইতে হইবে। এমন সময় স্পিকারের শব্দে তাঁহার ভাবনায় ছেদ পড়িলো। বাহির হইতে হিন্দি গানের শব্দ শুনিয়া জানালার পর্দা সরাইয়া দেখিলো পারুদের বাড়ি মরিচ বাতি দিয়া সাজানো হইয়াছে। বাড়ির সম্মুখে বিবাহের গেট সাজানো হইয়াছে। সেদিক হইতেই হিন্দি গানের শব্দ আসিতেছে। দেভু কৌতূহল নিবৃত্ত করিতে না পারিয়া তাঁহার মাতাকে জিজ্ঞাস করিলো। জানিলো যে পারুর বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছে। পারুর পিতা বিস্তর পয়সা খরচ করিয়া , বিশাল অঙ্কের যৌতুক প্রদান করিয়া জামাই তুলিয়া আনিয়াছে ঘরে। পারুর "ঘর জামাই" দেখিতে যাইবার সাধ হইলো দেভুর। 

 সেই রাতে দেভু গুলশানের সেই প্রাসাদে উপস্থিত হইলো। পারুর বিবাহ হইয়াছে শুনিয়া তাঁহার মন খচ খচ করিতেছিলো সারাদিন। আফসোস করিতে লাগিলো তাহার কপালের। আজ পারু কে বিবাহ করিলে সে বিস্তর টাকা লইতে পারিতো শ্বশুড়ের নিকট হইতে আর এখন তাঁহার পকেট প্রায় ফাঁকা হইতে চলিয়াছে। অপরদিকে চন্দ্রার পিছনে এত খরচ করিয়াও চন্দ্রাকে অদ্যবধি ছুঁইতে পারিলো না। খালি পিছলাইয়া যায় এই সেই বলিয়া। ঠিক করিলো আজ সে চন্দ্রাকে লইয়া গোপন কক্ষে যাইবেই। ড্যান্স ফ্লোরে পূর্ব হইতেই সকল নেত্য সঙ্গী আসিয়া নেত্য করিতেছিলো, দেভু তাহাদের সহিত মিশিয়া গেল। সেদিন চন্দ্রা আসিয়া পৌছায়নি, তাহাকে ফোন করিয়াও তাঁহার ফোন বন্ধ পাইতেছে বার বার। দেভু বিরক্ত হইয়া উঠিলো। চন্দ্রা কে না পাইয়া তাঁহার মেজাজ যখন চরম, তখন নতুন এক সুন্দরী কন্যা তাঁহার দিকে হাত বাড়াইয়া দিলো। তাহাকে দেখিবা মাত্রই দেভুর মেজাজ শীতল বরফের ন্যায় হইয়া গেল মুহুর্তের মধ্যেই। দেভু সব ভুলিয়া তাঁহার সহিত নাচিতে লাগিলো। 

 নাচিতে নাচিতে তাহারা গোপন প্রকোষ্ঠে যাইবার প্রস্তুতি লইবে এমন সময় হঠাৎ করিয়া সকলেই দৌড়াইতে লাগিলো যে যেদিক পারে। হুলুস্থুল বাঁধিয়া গেল পুরো প্রাসাদ জুড়িয়া। পুলিশ আসিয়া প্রাসাদের চতুর্পাশ্বে ঘিরিয়া অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে অবস্থানরত সকলকে গ্রেফতার করিয়া ফেলিলো। সকল কক্ষ খুঁজিয়া, সকলকে ধরিয়া পুলিশ ভ্যানে উঠানো হইলো। অতঃপর তাহাদের নিকটবর্তি থানায় লইয়া যাইয়া গারদে ঢুকাইয়া দিলো সেই রাত্রিতে। পুলিশ আসিয়া রেইড দিবার সময় কিছু দুষ্টু সাংবাদিক লইয়া আসিয়াছিলো। তাহারা আবার সকলকে একত্র করিয়া কয়টা ছবি তুলিলো। সাংবাদিক দেখিয়া কেহ কেহ হাত দিয়া মুখ ঢাকিলো, কেহ বা পিছনে মুখ লুকাইলো । দেভু শুধু হাসিমুখ দিয়া পোজ দিয়া দাঁড়াইয়া কতকগুলি ছবি তুলিলো। সেই রাত্রে অন্য সকল আসামীদের সহিত দেভুদেরকেও রাখা হইয়াছিলো। ওহ শিট বলিতে বলিতে দেভু থানার জেলের ভিতরে পায়চারি করিতেছিলো, এমন সময় অপর এক আসামী দেভু কে ডাকিয়া কহিলো - তাঁহার পদযুগল টিপিয়া দিবার জন্য। তাঁহার চেহারা দেখিয়া দেভু ভয়ে ভয়ে পা টিপিয়া দিতে উদ্যত হইলো। 

 পরদিন সকালে সকল জাতীয় পত্রিকায় দেভুদের ধারণকৃত ছবি ছাপাইয়া বিশাল রিপোর্ট করিলো। গুলশানের মতন এলাকায় এরকম অসামাজিক কাজের বর্ননা শুনিয়া সকলেই ছিঃ ছিঃ করিতে লাগিলো, দেশ ধর্ম রসাতলে যাইতেছে দেখিয়া অভিভাবক কূল উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলো। নারায়ন মুখার্জি অন্যদিনের মত সেদিনও সকালে উঠিয়া চা পান করিতে করিতে করিতে পত্রিকা পাঠ করিতেছিলেন। তিনিও সেই রিপোর্টখানি পড়িলেন অন্যান্য খবর পড়িলেন। পড়িয়া পত্রিকা রাখিতে যাইবেন এমন সময় একটি ছবির দিকে তাঁহার নজর আটকাইয়া যায়। দেখেন যে গতকালের রাত্রের ঘটনায় আটককৃতদের একখানা ছবি, সকলেই মুখ লুকাইতে ব্যস্ত আর একজন হাসি হাসি মুখ করিয়া চাহিয়া আছে। তিনি দেখিলেন, আর কেহ নহে, ইহা তাহাদের দেভু। দেভুর ছবি দেখিয়া ''কৌশিল্যা" বলিয়া চিৎকার করিয়াই নারায়ন মুখার্জি হার্টফেল করিলেন। 
 [সমাপ্ত]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন